Melbondhon
এখানে আপনার নাম এবং ইমেলএড্রেস দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন অথবা নাম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন
widgeo

http://melbondhon.yours.tv
CLOCK
Time in Kolkata:

স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ

Go down

স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ Empty স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ

Post by Admin on 2012-12-02, 13:56

স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ
এর মহাজীবন ও আদর্শ
************************
স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ ১৮৯৬ সালে ২৯ জানুয়ারী বুধনার মাঘীপূর্ণিমা তিথিতে মাদারীপুর জেল...
ার বাজিতপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা বিষ্ণুচরণ ভূঞা ও মাতা সারদাদেবীর সাধনায় তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব মহাদেব বর প্রদান করেন, তাদের ঘরে পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করবেন। পুণ্যময়ী মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে বুধবারে তাঁর জন্ম হয়। বাল্য নাম ছিল বিনোদ। বাল্যকাল হতেই বিনোদ শান্ত-সমহিত-শিবভাবে নিমগ্ন। সংযম ও ব্রহ্মচর্যর সাধনায় সংকল্পবদ্ধ।
১৮৯৬ সালের ২৯ জানুয়ারী, বুধবার। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। ধরার বুকে আলোর জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। সারা আকাশ চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করছে। সেদিন সেই মাঘী পূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে একই সাথে দুটি চাঁদ উঠেছিল। একটি আকাশের গায়ে, আর একটি মাটির পৃথিবীর বুকে মায়ের কোল আলো করে। মাতা সারদা দেবীর কোল আলো করে সেদিন যে চাঁদের উদয় হয়েছিল, তার স্নিগ্ধ আলোয় অগণিত ভক্তের হৃদয় আলোকিত হয়েছে। শত সহস্র ভক্ত সন্তানের হৃদয়ে অন্ধকার দূর করেছে। তাপিত চিত্তে নির্ঝরিত হয়েছে অযাচিত করুণার ধারা। আর্ত পীড়িতকে দিয়েছে আশ্রয়, উৎপীড়িতকে শুনিয়েছে অভয় বাণী। বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার এক গ্রাম বাজিতপুর। কুমার নদী থেকে প্রায় এক মাইল দূরে এই গ্রাম। এই গ্রামে বিষ্ণুচরণ ভুঁইয়া একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। অত্যন্ত তেজস্বী ও রাশভারী লোক ছিলেন এই বিষ্ণুচরণ; তাই গ্রামের লোক তাঁকে অত্যন্ত সমীহ করে চলত। বাইরের কঠোর প্রকৃতির এই লোকটির ভিতরটা ছিল খুবই কোমল। পরের দুঃখে তাঁর মন সহজেই কেঁদে উঠত। গ্রামের জমিদারের সেরেস্তায় কাজ করতেন বিষ্ণুচরণ। কিন্তু বৈষয়িক ব্যাপারে সেই জমিদারের সঙ্গেই বিষ্ণুচরণের দ্বন্দ্ব ও মামলা-মকদ্দমা বাধেঁ।এই অসম লড়াই চলেছিল কুড়ি বছর। নানাদিক থেকে বিপন্ন হয়েও বিষ্ণুচরণ মুষড়ে পড়েননি। ত্যাগ করেননি সত্যের পথ, ন্যায়ের পথ। দুঃখের দিনে একমাত্র আশ্রয়স্থ-গৃহদেবতা নীলরুদ্রশিব। শক্তিমানের অত্যাচার থেকে দীনদরিদ্রের উদ্ধারের জন্য ভক্তহৃদয়ের আকুল প্রার্থনায় দেবাদিদেব মহাদেবের আসন টলে উঠেছিল। বিষ্ণু ভুঁইঞার স্ত্রী সারদা দেবী। সেবায়, ভক্তিতে, সরলতায় সারদাদেবীর তুলনা হয় না। প্রাণ ছিল তাঁর কোমলতায় ভরা। তিনি ছিলেন শুচিতা আর পবিত্রতার প্রতিমূর্তি। একদিন সারদাদেবী স্বপ্ন দেখলেন কৈলাসপতি মহাদেব একটি ছোট শিশু হয়ে তাঁর কোলে শুয়ে আছে। আনন্দে ও বিষ্ময়ে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। আজীবন তিনি নিষ্ঠার সাথে সেবা করেছেন গৃহদেবতা নীলরুদ্র শিবকে; এতদিনে ঠাকুরের দয়া হ’ল। ঠাকুর কি সত্যি সত্যিই আসবেন তাঁর ঘরে ?সব কথা স্বামীকে জানালেন। বিষ্ণুচরণ বিস্তিত হননি। তিনিও অনাহারে অনিদ্রায় দুশ্চর তপস্যা করেছিলেন সবার চোখের আড়ালে। ১৮৯৬ খ্রীঃ ২৯ জানুয়ারী মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে বুধবার মাতা সারদাদেবীর কোলে যে শিশুটি এল সে এক অদ্ভুত শিশু। শিশুর জন্ম-মুহূর্তে আমরা কান্না শুনতেই অভ্যস্ত। আশ্চর্যের কথা জন্মক্ষণে এই শিশুটির কন্ঠে কেউ কান্না শোনেনি। শিশুর জন্মের পর থেকেই বিষ্ণুচরণের সংসারে এল পরিবর্তন। বিশ বছর পর জমিদারের সাথে মামলায় জয়ী হলেন তিনি। লক্ষ্মীর অযাচিত কৃপা বর্ষিত হতে লাগল তাঁর সংসারে। দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলায় জয়ী হয়েছেন ছেলের জন্মের পর, তাই ছেলের নাম রাখলেন “জয়নাথ”, তাই পরিবারের পরিজনেরা ডাকে “বুধো” বলে। ছেলে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। ধুমধাম করে ছেলের মুখে-ভাত হয়। এই সময় নাম দেওয়া হ’ল বিনোদ।
বিনোদের মনটি ছিল ছেলেবেলা থেকেই কোমল। সবাইকে সে ভালবাসত; সবার দুঃখেই তাই প্রাণ কাঁদত। তার এই ভালাসা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না- তা ছিল সর্বজীবে বিস্তৃত। মূক প্রাণীর কষ্ট তাকে পীড়িত করত। মন বেদনায় ভরে যেত। তখন বর্ষাকাল। খাল, মাঠ, পুকুর সব জলের তলায়, ছেলে-বুড়ো সবাই এসময় নৌকায় খালে বিলে মাছ ধরে। একদিন বিনোদের দাদা জাল নিয়ে নৌকায় বিলে গিয়েছে মাছ ধরতে। সঙ্গে নিয়েছে নয় বছরের বালক বিনোদকে। গ্রামের ছেলেরা আট-ন বছরেই নৌকা বাইতে পারে। তাই বিনোদকে দাদার সঙ্গী হতে হয়েছে, সে নৌকা বাইবে আর মাছ পাহারা দেবে। দাদার জালে একটা বড় শোল মাছ ধরা পড়ল। মাছটাকে নৌকার খোলে রেখে দাদা ভাইকে বলল, “বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মাছটাকে কাবু কর, না হয় লাফিয়ে চলে যাবে।” দাদা ভাইকে হুকুম দিয়ে আবার মাছ ধরতে মনোযোগী হল। অন্য যে কোন ছেলে হলে তখনই মাছটাকে বৈঠা মেরে ঠান্ডা করত। জ্যান্ত শৈল মাছকে কাবু না করে নৌকার খোলে আটকে রাখা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু বিনোদ কি করে মাছকে কাবু করবে, মাছটার ছটফটানি দেখে সে নিজেই কাবু। তার মন মাছটার জন্য আকুলি বিকুলি করছে। তারমন চাইছে মাছটা ছেড়ে দিতে, দাদা তাহলে বৈঠা দিয়ে তারমাথাই ভাঙবে, তাই দাদার ভয়ে মাছটাকে ছেড়ে দিতে পারছে না। আবার দাদার হুকুমমত বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মাছটাকে কাবু করতেও তার মন উঠছে না। মাছটার ছটফটানি দেখে তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। মাছটা লাফিয়ে জলে পড়লে যেন সে প্রাণ ফিরে পায়। ছটফট করতে করতে মাছটা হঠাৎ এক লাফ দিয়ে জলে পড়ল। যাক্ বাঁচা গেল, কিন্তু বাঁচল কে ? বিনোদ না মাছটা। বিনোদই বাঁচল, মাছটার অবস্থা দেখে তার দম বন্ধহয়ে আসছিল। মাছটা জলে গিয়ে পড়ায় বিনোদ বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বাঁচল। জীবে প্রেম বিনোদ বই পড়ে শেখেনি। সর্বজীবে প্রেম নিয়েই সে জন্মেছিল। তাই সেদিন দাদার বকুনি গায়ে লাগেনি। অনেক বাড়ীতে পোষা কুকুর-বেড়াল থাকে, কেউ পাখী পোষে, আদর করে। কিন্তু একটা গোসাপের বাচ্চা কেউ দেখে, ভয়ে ঘেন্নায় আঁৎকে উঠবে। বিনোদ একদিন দেখল বাড়ীর পাশে বেত ঝোপের কোণে একটা গোসাপের বাচ্চা মরার মত পড়ে আছে। বিনোদ সে বাচ্চাটাকে তুলে এসে কয়েকদিন ধরে যত্ন করে দুধ খাইয়ে বাচিয়েঁ তুলে বনে ছেড়ে দিল। পরদুঃখের দুঃখী বিনোদের মন ছিল ফুলের মত কোমল। আবার প্রয়োজন হলে সে দৃঢ় সংকল্পে অবিচল। ছেলে বয়সে বিনোদ ছিল জেদী। যে কাজে সে হাত দেবে, সে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর শান্তি নেই। এতে যত বাধাবিঘ্ন আসুক-না-কেন, কাজটি শেষ করাই চাই। এই প্রবল ইচ্ছাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বিনোদের প্রতি প্রচেষ্টাকে সাফল্যের পথে নিয়ে গিয়েছে। তার বাল্য ও কিশোর জীবনের ছোট ছোট সাধারণ ঘটনার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনের ইঙ্গিত আমরা পাই।
বিনোদকে পাঠশালায় দেওয়া হয়েছে। অন্যসব ছেলের মত সেও পাততাড়ি বগলেকরে পাঠশালায় যায়, কিন্তু পড়াশুনায় আগ্রহ তার খুব বেশী নেই। বিনোদ ত আর দশজন ছেলের মত নয়। সব সময় কি যেন সে ভাবছে। সাধারণ ছেলেদের মত পড়াশুনা করে চাকরি করবে, বিয়ে করে সংসারী হয়ে পরিবার প্রতিপালন করবে, এজন্য তো বিনোদ আসেনি। তার যে অন্যকাজ, অনেক কাজ, তাই তার চালচলন আলাদা, তাকে যে জাতি গড়তে হবে। তাই তার ভাবনা, তার প্রস্তুতি আলাদা। ছোট ছোট আর পাঁচটা ছেলের সাথে মিশে খেলাধূলা, হৈ হাঙ্গামায় তাকে দেখা যায় না। প্রায়ই সে চুপচাপ বসে থাকে। কখনও তাকে একা একা এক জায়গায় চার-পাঁচ ঘন্টা বসে থাকতে দেখা যায়। কিসের ধ্যানে বালক মগ্ন? কার চিন্তায় বালকের বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত? দেখে মনে হত বালক বিনোদ দেহের মধ্যে থেকেও দেহে নেই। কোন সুদূর লোকে তার মন পাড়ি জমিয়েছে। ধীরে ধীরে বিনোদ বড় হতে লাগল। পাঠশালার গন্ডি পার হয়ে বিনোদ গ্রামের হাই স্কুলে ভর্তি হল। এখানেও সেই একই ভাব, পড়তে হয় তাই পড়ে। পড়াশুনায় খুব মনোযোগ নেই। সে যেন অন্য জগতের অধিবাসী। অনাবশ্যক কথা সে কোনদিনই বলত না। স্কুলে চুপচাট রোজ একটা নিদির্ষ্ট জায়গায় বসত। ক্লাসে পড়া হচ্ছে, সামনে বই খোলা, কিন্তু মন তার সেদিকে আছে বলে মনে হয় না। সবসময় যেন একটা আত্মসমাহিত ভাব। স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে, ক্লাস খালি, তার খেয়াল নেই, তার মন ডুবে আছে কোন্ গভীরে কে জানে। হঠাৎ যখন খেয়াল হল ছেলেরা তো বাড়ী চলে গিয়েছে। সে ধীরে ধীরে চলল বাড়ীর পথে। বিনোদ পড়ায় মনোযোগী নয়; এজন্য তার শিক্ষকরা কি অখুশী; তার উপর বিরক্ত? মোটেই না। তাঁরা তাদেঁর এই অসাধারণ ছেলেটিকে একটু বেশী স্নেহের চোখেই দেখতেন। তার আচরণে স্বাতন্ত্র্যের জন্য অন্যসব ছেলেদের মনে তার জন্য শ্রদ্ধা মেশানো ভালবাসাই ছিল। এই বাক্ সংযত ছেলেটির কি যেন একটা বৈশিষ্ট্য ছিল যা চুত্বকের মত অদৃশ্যথেকে সবাইকে আকর্ষণ করত। সবার মুখেই তার প্রশংসা। ছাত্র-শিক্ষক সবাই বিনোদের গুণে মুগ্ধ। বছরের শেষে স্কুলে Good Conduct এর পুরস্কার বিনোদ ছাড়া অন্য কেউ পাবে, একথা ভাবাই যেত না। বিদ্যালয়ের সব ছেলের মধ্যে সে ছিল আদর্শ। তাই তাকেই দেওয়া হত এই পুরস্কার।
দৈহিক শক্তির অধিকারী হতে হলে খেতে হবে ঘি-দুধ, মাছ-মাংস, ফল ও নানারকম পুষ্টিকর খাদ্য। এটাই আমাদের সাধারণ-ধারণা। বিনোদ ছিল এই বিশ্বাস বা ধারণার মুর্তিমান প্রতিবাদ। সাধারণ আলুসেদ্ধ ভাত খেয়েই বিনোদ ছিল অসাধারণ শক্তির অধিকারী। সে প্রতিদিন ব্যায়ম করত। হাজার ডন-বৈঠক ছিল তার কাছে মামুলি ব্যাপার। এ ছাড়া নিয়মিত মুগুর ভাঁজাতো। পরবর্তী কালে মাদারীপুর আশ্রমে রক্ষিত গাবগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি তাঁর ব্যবহৃত দু’টো গদা দেখে অনেকেই বিস্মিত হযেছেন। ব্রহ্মচারী বিনোদের বিস্ময়কর দৈহিক শক্তির পরিচয় গ্রামের অনেকেই পেয়েছে। তার শারীরিক শক্তির পরিচয় প্রত্যক্ষ করে একদিন তার এক লীলাসহচর সতীশবাবু বিস্ময়ে হতবাক্। সতীশবাবুর বাড়ীর কাছে একটা খাল ছিল; একদিন ৭/৮ জন লোক একটা দু’শো মনী নৌকা (অর্থাৎ দুশোমণ মাল বইতে পারে এমন নৌকা) আলকাতরা দেবার জন্য পারে উঠাবার চেষ্টা করছিল, প্রাণপণ চেষ্টা করে যখন তারা নৌকাটি তুলতে পাল না তখন বিনোদতাদের বলল “তোরা ভাত খান না ছাই খাস?”তাদের সবাইকে সরিয়ে দিয়ে একাই কাছি ধরে নৌকাখানিকে পাড়ে তুলে দিলেন। ওখানে যারা ছিল সবাই তো অবাক্। বিষ্ণু ভুঁইঞার ধারণা ছিল বিনোদ নুন-ভাত খায়, তার গায়ে কোন শক্তি নেই। শুধু ভাত খেয়ে তার শক্তি আসবে কোথা থেকে। দেহ বিশাল হলে কি হবে ও শুধু চর্বি- এই ছিল তার মনোভাব। একদিন একটা বড় গাছ করাত দিয়ে চেরা হবে। গাছটাকে একটা মাচার উটর তুলতে হবে, সেই মত লোকজনের প্রয়োজন। বিষ্ণু ভুঁইঞা নিজে কাজ দেখাশোনা করছেন। ব্রহ্মচারী সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। সবাই তাকে গাছটি ধরতে অনুরোধ করল। ব্রহ্মচারী একটু হেসে সবাইকে সরিয়ে ১৫/১৬ জন লোক যে গাছটি ওঠাতে পারেনি, তা একাই উঠিয়ে ঠিক জায়গামত রেখে দিলেন। বিষ্ণু ভুঁইঞা দূর থেকে দেখে বিস্মিত হয়েন। মাছ-মাংস-ডিম না খেলে শরীরে জোর হয় না এই ভুল ধারণা তাঁর দূর হল।
১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দে বিনোদ দশম শ্রেণীর ছাত্র। শ্রীযুক্ত বীরেন্দ্রলাল ভট্টাচার্য এলেন বাজিতপুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই বিনোদের অসাধারণ গুণে মুগ্ধ হয়ে শিক্ষক-ছাত্রের ঘনিষ্ঠতা হয়। তখন প্রধান শিক্ষক মহাশয় বিনোদের মাঝে একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করলেন।সংসারে থেকে কিছু হবে না। কারো উপকার করা যাবে না, তাই যেন একটা পালাই পালাই ভাব। একদিন কথা প্রসঙ্গে বিনোদ মাষ্টার মহাশয়কে বলল, “ভাল লাগছে না মাস্টারমশায়, রেবিয়ে যাব, সন্ন্যাসী হব- না হলে তরুণদের রক্ষা করাযাবে না, দেশকে বাঁচানো যাবে না।, ছেলেদের দুরবস্থা চোখে দেখা যায় না।” প্রথম প্রথম বীরেন্দ্র বাবু তাকে বুঝাতে চেষ্টা করেছিলেন, যেন সংসার ত্যাগ না করে। কিন্তু পরে যখন বুঝলেন এ ছেলেকে কোন অবস্থাতেই ঘরে রাখা যাবে না তখন তিনি তাকে গোরক্ষপুরের যোগীরাজ গম্ভীরনাথ বাবাজীর কাছ থেকে দীক্ষা নেবার কথা বললেন। প্রথমে বিনোদ দীক্ষা নেবার ব্যাপারে উৎসাহ দেখায়নি। সে জিজ্ঞেস করেছিল, “মানুষ আবার মানুষের গুরু হয় কি করে?” কিন্তু কিছু পর এ প্রশ্নের উত্তর নিচে থেকেই খুজে পেয়ে সে মাস্টার মহাশয়ের কাছে গিয়ে বলল, “মাস্টারমশায় আমি যাব, দীক্ষা নেব।” ১৯১৩ খ্রীঃ পূজার ছুটিতে বীরেন্দ্রবাবু বিনোদকে নিয়ে গোরক্ষপুরে বাবা গম্ভীরনাথজীর সথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। স্থির হল বিজয়া দশমীর পর দিন শুক্লা একাদশীতে বিনোদের দীক্ষা। নাথজী আরও কয়েকজনকে সেদিন দীক্ষার জন্য আসতে বলেছিলেন। নির্দিষ্ট সময়ে সবাই দীক্ষাস্থানে উপস্থিত, কিন্তু বিনোদনেই, সারা আশ্রমে খুঁজে তাকে পাওয়া গেল না- সবাই চিন্তিত- এ সময় সে কোথায় যেতে পারে। নাথজী তখন আশ্রম থেকে বেশ দূরে একটা গাছ দেখিয়ে বললেন, “বিনোদ ঐ গাছের তলায় বসে আছে, যাও তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এস।” গাছতলায় বসে নিবোদ ভাবছিল বাবা গম্ভীরনাথ দি আমার পূর্ব নিদির্ষ্ট গুরু হয়ে থাকে,তাহলে তিনি আমাকে খুঁজেই দীক্ষা দেবেন। বিনোদ যা ভেবেছিল তাই হল। নাথজী বিনোদকে ডেকে ভিন্নভাবে দীক্ষা দিলেন। বিনোদ হল ব্রহ্মচারী বিনোদ। ব্রহ্মচারী বিনোদের দীক্ষা ভারতের আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ব্রহ্মচারী মহারাজ মানব-কল্যাণমূলক যে বিরাট কর্মযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন তার শুভ-সূচনা এই দীক্ষার মধ্য দিয়ে হয়। স্বামী বেদানন্দজী ঠিকই বলেছেন, “ব্রহ্মচারীর হৃদয়স্থিত বিরাট আধ্যাত্মিক শক্তি ভান্ডারে মহাত্মা গম্ভীরনাথজীর যোগশক্তির অগ্নিস্ফূলিঙ্গ নিক্ষিপ্ত হইলে উহা বৃহত্তর দাবানলের ন্যায় প্রদীপ্ত তেজে প্রজ্জ্বলিত হইয়া সমাজ ও জাতির মধ্যে যুগযুগ-সঞ্চিত পাপ-তাপ-কুসংস্কাররাশি ভস্মীভূত করিতে অগ্রসর হইল।
গোরক্ষপুরের মহাযোগী বাবা গম্ভীরনাথজীর নিকট ১৯১৩ সালে ১৭ বৎসর বয়সে তিনি দীক্ষালাভ করেন এবং ১৯১৬ সালে মাত্র ২০ বৎসর বয়সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। ১৯২৪ সালে প্রয়াগে অর্দ্ধকুম্ভমেলায় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরির নিকট আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্বক স্বামী প্রণবানন্দ নামে পরিচিত হন এবং সদ্গুরু রূপে অবতীর্ণ হয়ে প্রণব মঠে গুরু পূজার প্রবর্তন করেন। তখন থেকে হাজার হাজার নরনারী শান্তি ও মুক্তির আশায় আচার্য স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের শ্রীচরণে শরণাগত হয়। স্বামী প্রণবানন্দজী ছিলেন ত্যাগ-সংযম-সত্য-ব্রহ্মচর্য এবং সেবা ও মানব প্রেমের মূর্ত্তপ্রতীক। তরুণ ও যুবকদের নৈতিক চরিত্র গঠন ও গঠনে তাঁর আগ্রহ ছিল অপরিসীম। সনাতন হিন্দু ধর্মের প্রচার, সন্ন্যাসী সংঘ গঠন, আর্ত-পীড়িত ও বন্যা-প্লাবন-মহামারীতে দুর্গত মানুষের ত্রাণ, সমাজ-সংস্কার, তীর্থ সংস্কার, ধর্মচক্র ও কর্মচক্রের প্রবর্তন প্রভৃতি বহুবিধ লোক কল্যাণ কর্মের প্রবর্তণ করে ১৯৪১ সালে ৮ জানুয়ারী মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে তিনি দেহ ত্যাগ করেন। বাজিতপুরে শ্রীশ্রী প্রণব মঠে তাঁর পবিত্র দেহ সমাধিস্থ রয়েছে। স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ মহান ত্যাগ ও সাধনার মধ্য দিয়ে জগতের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করে গিয়েছেন। তাঁর অসম্পূর্ণ কার্য সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব তাঁরই আদর্শের পূজারী ত্যাগী সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী, তরুণ-যুবক তথা সমগ্র দেশবাসীর। প্রণব মঠ সেই আদর্শ সম্মুখে রেখেই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি ভারত সেবাশ্রম সংঘ এবং মালয়েশিয়ার ডিভাইন লাইফ সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
Admin
Admin
এডমিন
এডমিন

পোষ্ট : 811
রেপুটেশন : 41
নিবন্ধন তারিখ : 19/11/2010

http://melbondhon.yours.tv

Back to top Go down

Back to top


 
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum