Melbondhon
এখানে আপনার নাম এবং ইমেলএড্রেস দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন অথবা নাম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন
widgeo

http://melbondhon.yours.tv
CLOCK
Time in Kolkata:

মাস্টারদা সূর্য সেন

Go down

মাস্টারদা সূর্য সেন Empty মাস্টারদা সূর্য সেন

Post by সুমন্ত সরকার on 2013-03-22, 18:13

মাস্টারদা সূর্য সেন

সূর্য সেন বা সূর্যকুমার সেন, ডাকনাম কালু,
যিনি মাস্টারদা নামে সমধিক পরিচিত।ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী
স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। পূর্ববঙ্গে
জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে
সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নিজ জীবন বলীদান করেন।
সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের
২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় অর্থনৈতিক ভাবে অস্বচ্ছল
পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রাজমনি সেন এবং মাতার নাম শশী বালা
সেন। রাজমনি সেনের দুই ছেলে আর চার মেয়ে। সূর্য সেন তাঁদের পরিবারের
চতুর্থ সন্তান। দুই ছেলের নাম সূর্য ও কমল। চার মেয়ের নাম বরদাসুন্দরী,
সাবিত্রী, ভানুমতী ও প্রমিলা। শৈশবে পিতা মাতাকে হারানো সূর্য সেন কাকা
গৌরমনি সেনের কাছে মানুষ হয়েছেন।সূর্য সেন ছেলেবেলা থেকেই খুব মনোযোগী ভাল
ছাত্র ছিলেন এবং ধর্মভাবাপন্ন গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন।
তাঁর প্রথম
স্কুল ছিল দয়াময়ী উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়। পরে তিনি নোয়াপাড়া উচ্চ
ইংরেজি বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর তিনি ন্যাশনাল
হাই স্কুলে ভর্তি হন। সূর্য সেন ১৯১২ সালে চট্টগ্রামের নন্দনকাননে অবস্থিত
হরিশদত্তের ন্যাশনাল স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে চট্টগ্রাম কলেজে এফ.
এ.-তে ভর্তি হন। সে সময় আই.এ বা বর্তমানের এইচএসসি পরীক্ষার পরিবর্তে
ফার্স্ট আর্টস বা এফ. এ. পরীক্ষার নিয়ম ছিল। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এফ. এ.
পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে পাশ করে তিনি একই কলেজে বিএ-তে ভর্তি হয়েছিলেন।
কিন্তু তৃতীয় বর্ষের কোন এক সাময়িক পরীক্ষায় ভুলক্রমে টেবিলে পাঠ্যবই
রাখার কারণে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিতাড়িত হন। ফলে, তাঁকে বহররমপুর
কৃষ্ণনাথ কলেজে বিএ পড়তে যেতে হয়। ১৯১৮ সালে তিনি বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ
থেকে বিএ পাশ করেন এবং চট্টগ্রামে ফিরে এসে ব্রাহ্ম সমাজের প্রধান
আচার্য্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অসহযোগ আন্দোলনের
সময় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দেওয়ানবাজারে বিশিষ্ট উকিল অন্নদা
চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত অধুনালুপ্ত 'উমাতারা উচচ ইংরেজি বিদ্যালয়ে' অংকের
শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এসময় বিপ্লবী দলের সাথে তাঁর সম্পর্ক গভীরতর হয়ে
ওঠে এবং শিক্ষকতা করার কারণে তিনি 'মাস্টারদা' হিসেবে পরিচিত হন।

বিপ্লবী ভাবধারায় দীক্ষিত সূর্য সেন দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকে
একমাত্র তপস্যা হিসেবে নিয়েছিলেন। তাই তিনি বিবাহ-বিরোধী ছিলেন। কিন্তু
বিএ পাশ করে চট্টগ্রামে আসার পর থেকেই তাঁর বিবাহের কথাবার্তা অভিভাবকরা
তোলেন। অবশেষে তাঁর বড়ভাই শিক্ষক চন্দ্রনাথ সেন (সহোদর নয়) ও অন্যান্য
আত্মীয়দের বিশেষ অনুরোধে ১৯১৯ সালে তিনি চট্টগ্রামের কানুনগোপাড়ার
নগেন্দ্রনাথ দত্তের ষোল বছরের কন্যা পুষ্প দত্তকে বিয়ে করেন।
আত্মীয়-স্বজনের চাপে বিয়ে
করলেও মাস্টারদার মনে এ ধারণা বলবৎ ছিল যে, বিবাহিত জীবন তাকে
কর্তব্যভ্রষ্ট করবে, আদর্শচ্যুত করবে। তার ফলে স্ত্রীর সংগে একদিন তিনি কথা
পর্যন্ত বলেন নি। বিবাহের তৃতীয় দিনে হিন্দুদের মধ্যে যে ফুলশয্যার প্রথা
প্রচলিত আছে, সেদিন তিনি তাঁর বৌদিকে বলেন, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন স্ত্রীর
সংগে সহবাসে তাঁর মৃত্যু অনিবার্য। তাই তিনি সেদিনই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে
শহরে চলে আসেন এবং তারপর স্ত্রীর সাথে আর কোনদিন দেখা করেন নি।


১৯২৬ সালে সূর্য সেন পলাতক অবস্থায় কোলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রীটের এক মেসে
পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। সেখান থেকে তাঁকে বোম্বাইয়ের (মুম্বাই) রত্নগিরি
জেলে পাঠানো হয়। মাস্টারদা যখন রত্নগিরি জেলে আটক, তখন তাঁর স্ত্রীর কঠিন
টাইফয়েড রোগ হয়। দেওয়ানবাজারের যে বাসা থেকে মাস্টারদা পালিয়ে
গিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী সেখানে তখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। বহু দরখাস্তের পর
মাস্টারদাকে যখন পুলিশ পাহারায় রত্নগিরি জেল থেকে ছুটিতে চট্টগ্রাম আনা
হয় মূমুর্ষু স্ত্রীকে দেখার জন্য, তাঁর স্ত্রীর আয়ু তখন সম্পূর্ণ
নিঃশেষিত। সূর্য সেনের স্ত্রী বিপ্লবী কাজ-কর্মে তাঁকে নেয়ার জন্য মাঝে
মাঝে বয়োকনিষ্ঠ
(এই ছবিটি চট্টগ্রাম (বাংলাদেশ) এর আন্দরকিল্লায় অবস্থিত জে,এম,সেন হলে নির্মিত সুর্য সেনের আবক্ষ মূর্তির স্থির চিত্র।)

ভারতে ইংরেজ শাসনবিরোধী অরবিন্দ ঘোষ ১৮৯৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়া শেষ করে দেশে ফিরে বরোদা কলেজে সহকারী অধ্যক্ষের পদে যোগদান করেন। এ
সময় তিনি মহারাষ্টের গুপ্ত বিপ্লবী সমিতির নেতা দামোদর হরি চাপেকার এবং
রামকৃষ্ণ হরি চাপেকারের সংস্পর্শে এসে বিপ্লবে অনুপ্রানিত হলেন। তাঁর এবং
তরুণ ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের তৎপরতায় কলকাতার আপার সার্কুলার রোডের
একটি বাড়িতে বাংলার প্রথম গোপন বিপ্লবীদল “অনুশীলন” সমিতি গঠন করা হয়।
১৮৯৯-১৯০১ সালে গঠিত এই সমিতির সভাপতি ছিলেন প্রমথনাথ মিত্র এবং কোষাধ্যক্ষ
সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ দলে পরে যুক্ত হলেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষ,
যতীন্দ্রনাথ মুখার্জী, যোগেন্দ্র বিদ্যাভূষন প্রমুখ।অনুশীলন সমিতির
সদস্যদের লাঠি খেলা, অসি খেলা, ছোরা খেলা, কুস্তি, মুস্টিযুদ্ধ ইত্যাদি
শিক্ষা দেয়া হত। অরবিন্দ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখের চাঁদাতে এই
সমিতি চলত।লাঠি খেলা, অসি খেলা, ছোরা খেলায় তৃপ্ত থাকতে অস্বীকার জানিয়ে
বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী “অনুশীলন সমিতি” থেকে আলাদা
হয়ে “যুগান্তর” দল গঠন করে। “অনুশীলন” সমিতি এবং “যুগান্তর” এ দুই দলের
শাখা পূর্ব বাংলায় গড়ে উঠে। পুলিন দাসকে ঢাকা অনুশীলন সমিতির অধ্যক্ষ
নিযুক্ত করা হয়।এর সাথে আরো যুক্ত ছিলেন প্রতুল গাঙ্গুলী, কেদারেশ্বর সেন,
রবি সেন প্রমুখ।পশ্চিম বাংলার মানিকতলায় বিপ্লবীদের বোমার কারখানা
আবিস্কারের পর অরবিন্দ ঘোষ সহ অনেক বিপ্লবীদের আলিপুর বোমা মামলায় জড়ানো
হয়। ১৯০৭ সালে ঐ মামলার পলাতক কিছু আসামী গোপনে পালিয়ে চট্টগ্রাম আসেন।
এসময় তাদের আদর্শে অনুপ্রানিত হয়ে চট্টগ্রামে প্রথম বিপ্লবী সংগঠনের জন্ম
হয়। যামিনী সেন, মণীন্দ্র সেন আর অম্বিকা চক্রবর্তী প্রমুখ ছিলেন এই
সংগঠনের সদস্য। এই বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা কলকাতা থেকে গোপনভাবে প্রকাশিত
পত্র-পত্রিকা এবং ইস্তেহার চট্টগ্রামে বিলি করতেন। সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য
অস্ত্র এবং বিস্ফোরক তাদের হাতে ছিল না।
১৯১৬ সালে বহররমপুর কৃষ্ণনাথ
কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে সূর্য সেন সরাসরি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত
হন। বিপ্লবীদের গোপন ঘাঁটি এই কলেজ়ে তিনি অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর
সান্নিধ্যে আসেন। তিনি যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। সূর্য সেনকে তিনি
বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দেন।[১০] সূর্য সেন ১৯১৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে
চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন। ৪৯নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের
নগেন্দ্রনাথ সেন ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে এসে সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী ও
চারুবিকাশ দত্তের সাথে দেখা করেন। সূর্য সেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী
অম্বিকা চক্রবর্তী একই থানার পাশাপাশি গ্রামের ছাত্র হিসেবে ছোটবেলা থেকেই
পরস্পরের কাছে পরিচিত ছিলেন।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) শেষের দিকে
অনুরূপ সেন, চারুবিকাশ দত্ত, অম্বিকা চক্রবর্তী, নগেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখদের
সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে গোপন বিপ্লবী দল গঠন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য,
শুরুতে চট্টগ্রামের বিপ্লবী দল একটিই ছিল। তারা বাংলার প্রধান দু'টি
বিপ্লবী দল "যুগান্তর" এবং "অনুশীলন"- কোনটির সাথে একেবারে না মিশে গিয়ে
স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। বিপ্লবী নেতা সূর্য সেন
এবং অম্বিকা চক্রবর্তী তখন চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ানবাজার দেওয়ানজী
পুকুরপারে 'সাম্য আশ্রম' প্রতিষ্ঠা করে ওখানে থাকেন।সেখানে গোপনে বিপ্লবীরা
জমায়েত হয়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের অন্যতম নেতা চারুবিকাশ
দত্ত তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে "অনুশীলন" দলের সাথে যুক্ত হয়ে যান। এভাবে
চট্টগ্রামেও বাংলার অন্যান্য জেলার মত দু'টি বিপ্লবী দল গড়ে ওঠে। দুই দলে
বিভক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রামে যে বিপ্লবী দলটি নিজস্ব স্বতন্ত্রতা বজায়
রেখে কংগ্রেসের প্রকাশ্য আন্দোলনে কোলকাতার "যূগান্তর" দলের সঙ্গে সহযোগিতা
করত, সে দলের সাংগঠনিক কমিটি ছিল নিম্নরূপ- সভাপতি- সূর্য সেন; সহসভাপতি-
অম্বিকা চক্রবর্তী; শহর সংগঠনের দায়িত্বে- গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ; গ্রামের
সংগঠনের দায়িত্বে- নির্মল সেন। এছাড়া লোকনাথ বলকে ছাত্র আন্দোলন ও
ব্যায়ামাগার গঠন প্রভৃতি কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়।অনুরূপ সেন বিপ্লবীদলের
সংবিধান লিখলেন এবং তাঁকে ও নগেন্দ্রনাথ সেনকে কলকাতার অন্য দলগুলোর সাথে
যোগাযোগ এবং অস্ত্র সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়।
১৯২০ সালে
গান্ধীজী- কর্তৃক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে অনেক বিপ্লবী এই আন্দোলনে যোগ
দেন। গান্ধীজীর অনুরোধে বিপ্লবীরা তাদের কর্মসূচি এক বছরের জন্য বন্ধ
রাখেন।সূর্য সেন অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিলেন। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল
স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র ও বিপ্লবী অনন্ত সিংহ ছাত্র ধর্মঘট পরিচালনা
করার জন্য স্কুল থেকে বহিস্কৃত হন।মহাত্মা গান্ধী ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন
প্রত্যাহার করলে বিপ্লবী দলগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠে। তখন চট্টগ্রাম
কোর্টের ট্রেজারী থেকে পাহাড়তলীতে অবস্থিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কারখানার
শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন নিয়ে যাওয়া হতো। ১৯২৩-এর ১৩ ডিসেম্বর টাইগার
পাস এর মোড়ে সূর্য সেনের গুপ্ত সমিতির সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে বেতন
বাবদ নিয়ে যাওয়া ১৭,০০০ টাকার বস্তা ছিনতাই করে। ছিনতাইয়ের প্রায় দুই
সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক চলাকালীন অবস্থায় পুলিশ খবর পেয়ে বিপ্লবীদের
আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সাথে বিপ্লবীদের খন্ড যুদ্ধ হয় যা "নাগরখানা
পাহাড় খন্ডযুদ্ধ" নামে পরিচিত।যুদ্ধের পর গ্রেফতার হন সূর্য সেন এবং
অম্বিকা চক্রবর্তী। রেলওয়ে ডাকাতি মামলা শুরু হয় সূর্য সেন এবং অম্বিকা
চক্রবর্তীকে নিয়ে। অনন্ত সিং আর গণেশ ঘোষের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি
করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
এই মামলায় আসামি পক্ষের আইনজীবি ছিলেন। সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী এ
মামলা থেকে ছাড়া পেয়ে যান।গ্রেফতার করার পর বিপ্লবীদের উপর নির্যাতনের
কারনে কলকাতা পুলিশ কমিশনার টেগার্টকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে বিপ্লবীরা।
এই পরিকল্পনার কথা পুলিশ আগে থেকেই জানতে পারে। এ কারনে ২৫ অক্টোবর ১৯২৪
সালে গ্রেফতার হন গণেশ ঘোষ, নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং সহ
আরো কয়েকজন।[পুলিশকে বার বার
ফাঁকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর সূর্য সেন কলকাতার
ওয়েলিংটন স্ট্রীটে গ্রেফতার হন। বন্দী হবার পর তাঁকে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল
জেলে রাখা হয়। পরে বোম্বের রত্নগিরি জেলে পাঠানো হয়, সেখান থেকে বেলগাঁও
জেলে।১৯২৭ সালে নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং মুক্তি পান। আর
১৯২৮ সালের শেষভাগে সূর্য সেন ও গণেশ ঘোষ জেল থেকে ছাড়া পান।
বিপ্লবী
সংগঠনে মেয়েদের সদস্য করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। বিপ্লবীদের প্রতি মা,
নিজের বোন এবং অন্যান্য নিকট আত্নীয় ছাড়া অন্য মেয়েদের সাথে মেলামেশা
না করার নির্দেশ ছিলো মাষ্টার’দা সূর্য সেনের।পরে তিনি এই নির্দেশ শিথিল
করেন। এতে পরবর্তীতে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বিপ্লবী সংগঠনে
যোগ দেন।
১৯২৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসে নিখিল ভারত কংগ্রেস
কমিটির বার্ষিক অধিবেশন হয়। ঐ অধিবেশনে চট্টগ্রাম থেকে যে প্রতিনিধিরা
ছিলেন তাঁরা হলেন সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং, নির্মল সেন,
লোকনাথ বল, তারকেশ্বর দস্তিদার প্রমুখ। সেখানে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের
সাথে সূর্য সেনের সাথে বৈঠক হয়। ১৯২৯ সালে মহিমচন্দ্র দাস এবং বিপ্লবী
সূর্য সেন যথাক্রমে চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সভাপতি এবং সম্পাদক নির্বাচিত
হন। ঐ বছর বিপ্লবী নেতাদের উপর পুলিশের পাহারা আরো জোরদার করার জন্য
কলকাতার কেন্দ্রীয় অফিস থেকে নির্দেশ আসে। ১১ জন গোয়েন্দা এবং চব্বিশজন
পুলিশ নিয়োগ করা হলো ছয়জন বিপ্লবী নেতার জন্য।১৯৩০ সালের শুরু থেকেই
আসকার খাঁর দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত কংগ্রেস অফিসে সূর্য সেন এবং
অম্বিকা চক্রবর্তী ভবিষ্যৎ এর সশস্ত্র বিপ্লবের রুপরেখা নিয়ে বিভিন্ন নেতা
কর্মীদের সাথে আলোচনা করতেন। এসব আলোচনার পর ঠিক করা হয় শুধু শহর না, বরং
বিভিন্ন গ্রাম এবং কক্সবাজার থেকেও বিপ্লবীদের নেয়া হবে।আইরিশ রিপাবলিকান
আর্মির বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের দলের নাম পরিবর্তন করে
রাখা হয় “ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চিটাগাং ব্রাঞ্চ”।বাংলায় “ভারতীয় প্রজাতান্ত্রিক বাহিনী, চট্টগ্রাম শাখা”।। আইরিশ বিপ্লবের ধাঁচে একটা পরিকল্পনা তৈরি করা হয় যার মূল কর্মসূচী ছিলঃন করা।
পরিকল্পনা অনুসারে কাজের জন্য কয়েকটা দল গঠন করা হয়। সূর্য সেনের দলের
সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৫ জন, অম্বিকা চক্রবর্তীর ১৫ জন, অনন্ত সিং এবং গণেশ
ঘোষের ২২ জন, নির্মল সেনের ৬ জন। এই দলগুলোর মধ্যে আবার উপদল ছিল।ইতোমধ্যেই
চলছিলো অস্ত্র সংগ্রহ এবং বোমা তৈরির কাজ।
১৮ এপ্রিল ১৯৩০, শুক্রবার
রাত ৮টা বিদ্রোহের দিন হিসাবে ঠিক হয়। পরে তা দশটা করা হয়। চারটা বাড়ি
হতে চারটা দল আক্রমণের জন্য বের হয়। সে রাতেই ধুম রেলস্টেশনে একটা
মালবহনকারী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে উল্টে যায়। একদল বিপ্লবী আগে থেকেই রেল
লাইনের ফিসপ্লেট খুলে নেয়। এর ফলে চট্টগ্রাম সমগ্র বাংলাদেশ থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।অন্য একটি দল চট্টগ্রামের নন্দনকাননে টেলিফোন এবং
টেলিগ্রাফ অফিস আক্রমণ করে। হাতুড়ি দিয়ে তারা সব যন্ত্রপাতি ভেঙ্গে দেয়
এবং পেট্রোল ঢেলে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়।আরেকটি দল পাহাড়তলীতে
অবস্থিত চট্টগ্রাম রেলওয়ে অস্ত্রাগার দখল করে নেয়। উন্নতমানের রিভলবার ও
রাইফেল গাড়ীতে নিয়ে অস্ত্রাগারটি পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানো হয়। তবে
সেখানে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি।সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিপ্লবীরা
দামপাড়ায় পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক দখল করে নেয়। এই আক্রমনে অংশ নেয়া
বিপ্পবীরা দামপাড়া পুলিশ লাইনে সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
মিলিটারি কায়দায় কুচকাওয়াজ করে সূর্য সেনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সূর্য
সেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষনা দেন।তিনি তার ঘোষনায় বলেন:

"The great task of revolution in India has fallen on the Indian
Republican Army. We in Chittagong have the honour to achieve this
patriotic task of revolution for fulfilling the aspiration and urge of
our nation. It is a matter of great glory that today our forces have
seized the strongholds of Government in Chittagong…The oppressive
foreign Government has closed to exist. The National Flag is flying
high. It is our duty to defend it with our life and blood".

চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরুপে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত ছিল চারদিন। কিন্তু
এরমধ্যে বিপ্লবীদের খাদ্যসংকট দেখা দিল এবং সূর্য সেন সহ অন্যদের কচি আম,
তেঁতুল পাতা, কাঁচা তরমুজ এবং তরমুজের খোসা খেয়ে কাটাতে হয়।সূর্য সেন সহ
ছয়জন শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবীকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার ৫০০০ টাকা পুরস্কার
ঘোষনা করে। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা যখন জালালাবাদ পাহাড়ে
(চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পাহাড়) অবস্থান করছিল সে সময় সশস্ত্র ইংরেজ
সৈন্যরা তাঁদের আক্রমণ করে। দুই ঘন্টার প্রচন্ড যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ৭০
থেকে ১০০ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন নিহত হয়।
জালালাবাদ যুদ্ধের পর বিপ্লবী নেতাদের ধরার জন্য রেলস্টেশন, স্টীমারঘাট হতে শুরু করে সব স্থানে অভিযান চলছিলো।বিপ্লবীরা
তখন বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে আত্মগোপন করে ছিলো। সূর্য সেন ১৬ জন
বিপ্লবীকে নিয়ে ২৪ এপ্রিল রাতে নিজ বাড়িতে আসেন।এর মধ্যে অনন্ত সিং
পুলিশের কাছে স্বেচ্ছায় ধরা দেন এবং কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে এবং এদের
বিরুদ্ধে অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলা শুরু হয়। এ মামলা শুরু হওয়ার পর অসুস্থ
অম্বিকা চক্রবর্তী পটিয়া থানার চক্রশালা গ্রামে গ্রেপ্তার হন। অম্বিকা
চক্রবর্তী এবং সেসময় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য বিপ্লবীদের নিয়ে দ্বিতীয়
অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলা শুরু হয়।প্রায় ১৯ মাস বিচারের পর ১৯৩২ সালের ১লা
মার্চ অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলার রায়ে অনন্ত সিং, লোকনাথ বল এবং গনেশ
ঘোষসহ ১২ জনকে দ্বীপান্তর বাসের আদেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে অপর মামলায়
অম্বিকা চক্রবর্তীর প্রাণদন্ডের আদেশ হয় পরে হাইকোর্টে আপিলের রায়ে
যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। এ রায়ের পর সূর্য সেনকে ধরার জন্য পটিয়া
এবং গোমদন্ডীতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। সরকার ৫০০০ টাকার পরিবর্তে
১০,০০০ পুরস্কার ঘোষনা করে।১৯৩২ সালের ১৩ জুন রাত ৯টায় পটিয়ার ধলঘাট
গ্রামে সাবিত্রী চক্রবর্তীর বাড়িতে তাঁকে ধরার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ
ক্যাপ্টেন ক্যামেরনকে গুলি করে সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং
কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন কিন্তু নির্মল সেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা
যান।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিলের (চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের দিন)
অন্যতম একটি পরিকল্পনা ছিল পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ কিন্তু গুড
ফ্রাইডে থাকায় সেদিন ঐ ক্লাবে কেউ ছিল না। মাস্টার’দা সূর্য সেন স্থির
করেন ২৩ সেপ্টেম্বর (১৯৩২ সাল) ইউরোপীয় ক্লাবে প্রীতিলতার নেতৃত্বে হামলা
করা হবে। এ প্রসজ্ঞে মাস্টার’দা লিখেছেন
"বাংলায় বীর যুবকের আজ অভাব
নাই। বালেশ্বর থেকে জালালাবাদ, কালারপোল পর্যন্ত এদের দৃপ্ত অভিযানে দেশের
মাটি বারে বারে বীর যুবকের রক্তে সিক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলার ঘরে ঘরে
মায়ের জাতিও যে শক্তির খেলাই মেতেছে, ইতিহাসে সে অধ্যায় আজো অলিখিত রয়ে
গেছে। মেয়েদের আত্মদানে সে অধ্যায় রচিত হোক এই-ই আমি চাই। ইংরেজ জানুক,
বিশ্বজগত জানুক, এদেশের মেয়েরাও মুক্তিযুদ্ধে পেছনে নেই”।
২৩
সেপ্টেম্বর রাতে প্রীতিলতা সূর্য সেন-এর নির্দেশে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ
করেন। হামলায় ৫৩ জন ইংরেজ হতাহত হয়েছিল। গুলিতে আহত প্রীতিলতা দৈহিকভাবে
অত্যাচারিত হওয়ার চাইতে থেকে স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নিলেন। তিনি পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

ইংরেজ প্রশাসন সূর্য সেনকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরার জন্য সর্বাত্নক
চেষ্টা অব্যাহত রাখে।সূর্য সেন গৈরলা গ্রামে ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের
বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী রাতে সেখানে এক
বৈঠকে ছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল
দাসগুপ্ত। ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্র সেন সূর্য সেনের উপস্থিতির খবর
পুলিশকে জানিয়ে দেয়। রাত প্রায় ১০টার দিকে পুলিশ আর সেনাবাহিনী
ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। রাতের অন্ধকারে গুলি বিনিময়
করে কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত আর সুশীল দাসগুপ্ত পালিয়ে
যেতে পারেন। কিন্তু রাত ২টার দিকে অস্ত্রসহ সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেন ধরা
পড়েন। তারপর ঐ বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ সূর্য সেনের নিজের হাতে লেখা
অর্ধসমাপ্ত আত্মজীবনীর খাতা উদ্ধার করে। সেই খাতার উপর লেখা ছিল “বিজয়া”।
বিচারের সময় “বিজয়াতে” লেখা তাঁর কথাগুলো বিপ্লব এবং প্রশাশনের বিরুদ্ধে
ষড়যন্ত্রের প্রমান হিসাবে অনেকবার ব্যবহার করা হয়।১৭ই ফেব্রুয়ারী রাতে
সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেনকে প্রথমে জেলা গোয়েন্দা সদর দপ্তরে, পরে কোর্ট
হয়ে চট্টগ্রাম জেলে নেয়া হয়। সূর্য সেন গ্রেপ্তার হবার খবর সংবাদপত্রে
প্রকাশিত হয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল “চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার
লুন্ঠন সম্পর্কে ফেরারী সূর্য সেনকে গত রাতে পটিয়া হইতে ৫ মাইল দূরে গৈরলা
নামক স্থানে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে। সূর্য সেনকে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার
লুন্ঠনের মামলায় প্রধান আসামি বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। গত ১৯৩০ সাল
হইতে সূর্য সেন পলাতক ছিলেন এবং তাঁহাকে ধরাইয়া দিবার জন্য গভর্নমেন্ট দশ
হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা করিয়াছিলেন”।১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বেঙ্গল চিফ সেক্রেটারী কর্তৃক লন্ডনে ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে কাছে পাঠানো রিপোর্টে লেখা হয়
“The outstanding event of the fortnight is the arrest on 17 February of
Surjya Sen of Chittagong Armoury Raid notoriety, who, as the leader and
brain of absconders, has been giving constant anxiety over the last
three years. It was unfortunate that when Surjya Sen and his companion
were arrested, 4 others made good their escape…But luck enters very
largely into these night operations and it certainly was a great stroke
of luck that Surjya Sen was secured”।
সূর্য সেন গ্রেফতার হবার পর
তারকেশ্বর দস্তিদার দলের নেতৃত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালের ১৮ই মে
আনোয়ারা থানার গহিরা গ্রামে পুলিশ আর মিলিটারীর সাথে সংঘর্ষের পর
তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্ত গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে
বিপ্লবীরা জেল থেকে সূর্য সেনকে মুক্ত করার জ়ন্য কয়েকবার চেষ্টা চালায়।
প্রতিবারই তাদের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়।
সূর্য সেন, তারকেশ্বর
দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তকে বিচারের জন্য ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২১/১২১এ
ধারা অনুযায়ী স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালের
কমিশনাররা ছিলেনঃ বাখরগঞ্জের দায়রা জজ ডব্লিউ ম্যাকসার্পি, সিলেটের
অতিরিক্ত দায়রা জজ রজনী ঘোষ এবং চট্টগ্রামের দায়রা জজ খোন্দকার আলী
তোয়েব। ১৫ জুন ১৯৩৩ এ শুরু হওয়া এ মামলায় কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা
হয়। আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের
প্রত্যক্ষ প্রমান উপস্থাপন করা যায়নি।১৪ আগষ্ট ১৯৩৩ সালে এই মামলার রায়
ঘোষনা করা হয়। পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকার খবর ছিলঃ “চট্টগ্রাম ১৪ই
আগষ্ট—অদ্য দ্বিপ্রহর ১২ ঘটিকার সময় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল হইতে চট্টগ্রাম
অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মামলার রায় প্রদত্ত হয়। ট্রাইব্যুনাল সূর্য সেনকে
১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করিয়া প্রাণদন্ডে দন্ডিত করেন। ওই একই
ধারায় তারকেশ্বর দস্তিদারের প্রতিও প্রাণদন্ডের আদেশ প্রদত্ত হয়। কুমারী
কল্পনা দত্তকে ভারতীয় দন্ডবিধির ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করিয়া
তাঁহার প্রতি যাবজ্জীবন দন্ডাদেশ প্রদান করা হয়। আদালত প্রাঙ্গনের
চারিদিকে পুলিশের বিশেষ বন্দোবস্ত করা হইয়াছিল। রায় প্রদত্ত হইবার পুর্বে
সেনাদল কিছুকাল শহরে কুচকাওয়াজ করে। আসামীরা শান্তচিত্তে দন্ডাদেশ গ্রহণ
করে এবং তৎক্ষণাৎ আদালত হইতে স্থানান্তরিত করা হয়। তাঁহারা বিপ্লবাত্নক
ধ্বনি করিতে করিতে আদালত গৃহ ত্যাগ করে। ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট রায়ের
উপসংহারীয় অংশ পাঠ করেন। ১৫০ খানা টাইপ করা কাগজে প্রদত্ত হইয়াছে।”
মামলার রায় প্রদানের পর তিনজন বিপ্লবীর পক্ষে কলকাতা হাইকোর্টে আপিলের
আবেদন করা হয়। ১৪ নভেম্বর ১৯৩৩ সালে হাইকোর্ট প্রদত্ত রায়ে স্পেশাল
ট্রাইব্যুনালের দেয়া দন্ড বহাল রাখে।

কনডেম্‌ড সেলে সূর্য সেনকে
কড়া পাহারায় নির্জন কুঠুরীতে রাখা হত। একজন কয়েদি মেথর সূর্য সেনের লেখা
চিঠি ময়লার টুকরিতে নিয়ে জেলের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বন্দী বিপ্লবীদের দিয়ে
আসতো।মৃত্যুর আগে জেলে আটক বিপ্লবী কালীকিঙ্কর দে’র কাছে সূর্য সেন
পেন্সিলে লেখা একটি বার্তা পাঠান। সে বার্তায় তিনি লেখেন “আমার শেষ
বাণী-আদর্শ ও একতা”। তিনি স্মরণ করেন তাঁর স্বপ্নের কথা--স্বাধীন ভারতের
স্বপ্ন যার জন্য জীবনভর উৎসাহ ভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মত তিনি ছুটেছেন।
তাঁর ভাষায় “ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যে সব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ
করেছেন, তাদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো”। তিনি
সংগঠনে বিভেদ না আসার জন্য একান্তভাবে আবেদন করেন ।শেষ দিনগুলোতে জেলে
থাকার সময় তাঁর একদিন গান শোনার খুব ইচ্ছা হল। সেই সময় জেলের অন্য এক
সেলে ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। রাত ১১টা/১২টার দিকে কল্পনা দত্ত
তাঁকে চিৎকার করে বলেন “এই বিনোদ, এই বিনোদ, দরজার কাছে আয়। মাষ্টারদা গান
শুনতে চেয়েছেন”। বিনোদ বিহারী গান জানতেন না। তবুও সূর্য সেনের জন্য
রবিঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গানটা গেয়ে
শোনালেন।১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারী মধ্যরাতে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর
দস্তিদারের ফাঁসী কার্যকর হবার কথা উল্লেখ করা হয়। সূর্য সেন কে এবং
তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মম ভাবে অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা
হাতুরী দিয়ে তাঁর দাঁত ভেঙ্গে দেয় এবং তাঁর হাড় ও ভেঙ্গে দেয়। হাতুরী
দিয়ে নির্মম ভাবে পিটিয়ে অত্যাচার করা হয়। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।
সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের লাশ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি
এবং হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি।ফাঁসীর পর লাশদুটো জেলখানা
থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ
দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজার “The Renown” এ তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে
বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।
কলকাতা মেট্রো সূর্য সেনের স্মরণে বাঁশদ্রোণীমেট্রো
স্টেশনটির নামকরণ করেছে "মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশন"। এছাড়া তাঁর
সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়।


বলিউডে ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন নিয়ে খেলে হাম জি জান সে
শীর্ষক একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে, যার প্রধান চরিত্র মাস্টার দা সূর্য
সেন। ২০১০ সালের ৩ ডিসেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত এই
ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেনবলিউড তারকা অভিষেক বচ্চন।এছাড়াও
চিট্টাগং নামক আরও একটি হিন্দি চলচিত্র মুক্তি পেয়েছে ২০১২ সালে তাঁর
জীবনের উপর ভিত্তি করে।
সুমন্ত সরকার
সুমন্ত সরকার
তারকা সদস্য
তারকা সদস্য

লিঙ্গ : Male
পোষ্ট : 216
রেপুটেশন : 3
শুভ জন্মদিন : 06/04/1988
নিবন্ধন তারিখ : 02/04/2011
বয়স : 31
অবস্থান : কোলকাতা, ভারত
পেশা : MCA

http://www.sumanta.com

Back to top Go down

Back to top


 
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum