Melbondhon
এখানে আপনার নাম এবং ইমেলএড্রেস দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন অথবা নাম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন
widgeo

http://melbondhon.yours.tv
CLOCK
Time in Kolkata:

১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবি হত্যার ইতিবৃত্ত

Go down

১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবি হত্যার ইতিবৃত্ত Empty ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবি হত্যার ইতিবৃত্ত

Post by Admin on 2010-12-14, 21:44

১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর, কারণ এই বছরই সংঘটিত হয়েছিল আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ। ২৫শে মার্চের কালরাত্রে পাকিস্তানীদের অতর্কিত হামলার শুরু থেকে ১৬ই ডিসেম্বরের গৌরবময় বিজয়ের আগ মূহুর্ত পর্যন্ত পাক-হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় কিছু দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-সামস বাহিনীসহ গোটা বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দেবার নিমিত্তে দেশের সব প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছিল। বুদ্ধিজীবিদের হত্যা মূলতঃ ১৪ই ডিসেম্বর সংঘটিত হলেও সারা বছরব্যাপী তা বিস্তৃত ছিল। ইংরেজী একটা ওয়েবসাইট থেকে সেই সময়ের বেশ কিছু দলিল পেলাম। সেই ইংরেজী দলিলের বাংলা অনুবাদ নিয়েই আমার এই সিরিজ। আশা করি সবাই মনোযোগ দিয়ে লেখাগুলো পড়বেন এবং অনুধাবন করতে পারবেন যে কি নির্মমভাবে আমাদের দেশের সূর্যসন্তানরা পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছিলেন। প্রত্যেক পর্বের শেষের দিকে সূত্র উল্লেখ থাকবে।


“…………… এটা এখন জ্ঞাত যে, ১২ই ডিসেম্বর রোববার,যখন ভারতীয় সারি ঢাকার দিকে এগিয়ে আসছিল, একদল উচ্চপদস্থ পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা এবং তাদের বেসামরিক সতীর্থরা শহরের প্রেসিডেন্সিয়াল বাসভবনে বৈঠকে বসে। তারা গ্রেফতার ও হত্যা করার জন্য ২৫০ জন মানুষের নাম একত্র করে, যাদের মধ্যে ছিল ঢাকার পেশাজীবি শ্রেণীদের মধ্যে সেরা মানুষ যারা এরই মধ্যে গৃহযুদ্ধে নিহত হয়নি।১৬ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পন সই হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে আল-বদর রাজাকার নামের একটি সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত উগ্র ডানপন্থী মুসলিমদের মধ্য থেকে চিহ্ণিত কিছু লোক দ্বারা তাঁদের সোমবার ও মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয়। উপদ্রুত ব্যক্তিদের দলবেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের একটি দুর্গম এলাকায়, যেখানে তাঁদের সমষ্টিগতভাবে হত্যা করা হয় ………………” (The Times, December 23, 1971)


ব্রিগেডিয়ার কাশেম এবং ক্যাপ্টেন কাইয়ুম ছিল পাক সেনাবাহিনীর দুইজন প্রধান কর্মকর্তা যারা এসমস্ত বুদ্ধিজীবিদের হত্যাকান্ড তদারক করত। তৎকালীন মাদ্রাসা শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি মাওলানা আবদুল মান্নানের সাথে তারা নভেম্বরের কোন এক সময়ে মান্নানের বাসভবনে বৈঠক করেছিল। এটা ছিল সম্ভবতঃ সেই বৈঠক, যেখানে বুদ্ধিজীবিদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
জনৈক মফিজুদ্দিন (লাশবাহী যানের চালক)-এর স্বীকারোক্তিমতে, নিউইয়র্কের কুইনস শাখার উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সংস্থা(ICNA)-র প্রধান এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য এবং রেডিও পাকিস্তান এর সাবেক কর্মচারী আশরাফুজ্জামান খান নিজের হাতে সাতজন শিক্ষককে গুলি করে।মফিজুদ্দিনের স্বীকারোক্তির ফলে হতভাগ্য এসব শিক্ষকবৃন্দের ছিন্নভিন্ন শরীর রায়েরবাজারের জলাভূমি এবং মিরপুরের শিয়ালবাড়ির গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়।তার ডায়েরীতে ২০জন শিক্ষক ও অন্যান্য বহু বাংলাদেশীর তালিকা ছিল।পাকিস্তানীদের দোসর ১৬ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তালিকা তার ডায়েরীতে ছিল।

শহীদ বুদ্ধিজীবিদের তালিকাঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দঃ

* এ. এন. এম. মুনির চৌধুরী * ডঃ জি. সি. দেব
* মুফাজ্জল হায়দার চৌধুরী * আনোয়ার পাশা * জ্যেতিময় গুহঠাকুরতা
* আবদুল মুক্তাদির * ডঃ এ. এন. এম. ফয়জুল মাহি * ফজলুর রহমান খান * এ. এন. এম. মনিরুজ্জামান * ডঃ সিরাজুল হক খান *ডঃ শাহাদাত আলী *ডঃ এম. এ. খায়ের * এ. আর. খান কাদিম *মুহাম্মদ সাদেক
* শরাফত আলী *গিয়াসউদ্দীন আহমেদ * আনন্দ পায়ান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দঃ

* অধ্যাপক কাইয়ুম * হাবিবুর রহমান * শ্রী সুখ রঞ্জন সমাদ্দার

জাতীয় পরিষদের সদস্যবৃন্দঃ

* মশিউর রহমান * আমজাদ হোসেন * আমিনুদ্দিন * নাজমুল হক সরকার * আবদুল হক * সৈয়দ আনোয়ার আলী * এ. কে. সরদার


সাংবাদিকবৃন্দের তালিকাঃ

* সিরাজউদ্দীন হোসেন * শহীদুল্লাহ্‌ কায়সার * খন্দকার আবু তালেব
* নিজামউদ্দীন আহমেদ * এ.এন. এম. গোলাম মোস্তফা * শহীদ সাবের
* শেখ আবদুল মান্নান (লাদু) * নাজমুল হক *এম আখতার
* আবুল বাশার * চিশতী হেলালুর রহমান * শিবসাধন চক্রবর্তী
* সেলিনা আখতার

চিকিৎসকদের তালিকাঃ

* মোঃ ফজলে রাব্বি * আবদুল আলীম চৌধুরী * সামসুদ্দীন আহমেদ
* আজহারুল হক *হুমায়ুন কবির * সোলায়মান খান *কায়সার উদ্দীন
* মনসুর আলী * গোলাম মর্তুজা * হাফেজ উদ্দীন খান জাহাঙ্গীর
* আবদুল জব্বার * এস.কে. লাল * হেম চন্দ্র বসাক *কাজী ওবায়দুল হক
* মিসেস আয়েশা বেদৌরা চৌধুরী * আলহাজ্ব মমতাজউদ্দীন
* হাসিময় হাজরা * নরেণ ঘোষ * জিকরুল হক * শামসুল হক
* এম. রহমান * এ. গফুর *মনসুর আলী *এস. কে. সেন * মফিজউদ্দীন
* অমূল্য কুমার চক্রবর্তী *আতিকুর রহমান *গোলাম সারওয়ার
* আর.সি. দাশ * মিহির কুমার সেন * সালেহ আহমেদ *অনিল কুমার সাহ * সুনীল চন্দ্র শর্মা * এ.কে.এম. গোলাম মোস্তফা *মকবুল আহমেদ
* এনামুল হক * মনসুর (কানু)* আশরাফ আলী তালুকদার
*লেফটেন্যান্ট জিয়াউর রহমান * লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জাহাঙ্গীর
* বদিউল আলম * লেফটেন্যান্ট কর্ণেল হাই * মেজর রেজাউর রহমান
* মেজর নাজমুল ইসলাম * আসাদুল হক * নাজির উদ্দীন
* লেফটেন্যান্ট নুরুল ইসলাম * কাজল ভদ্র * মনসুর উদ্দীন


শিক্ষাবিদবৃন্দের তালিকাঃ

* জহির রায়হান * পূর্ণেন্দু দস্তিদার * ফেরদৌস দৌলা * ইন্দু সাহা
* মেহেরুন্নেসা

শিল্পী, পেশাজীবি প্রভৃতিদের তালিকাঃ

* আলতাফ মাহমুদ * দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা * জোগেশ চন্দ্র ঘোষ
* ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত * শামসুজ্জামান * মাহবুব আহমেদ * খুরশিদ আলম
* নজরুল ইসলাম * মোজাম্মেল হক চৌধুরী * মহসিন আলী * মুজিবুল হক


সূত্র
আশরাফুজ্জামান খান-এর কুখ্যাত ডায়েরীর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা (প্রথম অংশ): - লিখেছেন জামাল হোসেন

আশরাফুজ্জামান খান কে? এটা এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা এখন তার ডায়েরীর বিষয়বস্তু জানি? অনুগ্রহ করে ধৈর্য্য ধরুন এবং এই লেখাটি পড়ুন। আমি আপনাকে এই লোকের শাস্তিযোগ্যতা সম্বন্ধে আপনার নিজের উপসংহার টানার সুযোগ দেব।

এটা ছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ –আমাদের নয় মাস দীর্ঘ জ্বলন্ত ও রক্তক্ষয়ী দিনের চূড়ান্ত অধ্যায়ও বটে। আমাদের অদম্য মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় সেনাদের যৌথ কর্তৃত্বের শক্তি ঢাকাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল। কিন্তু যদিও অবরুদ্ধ পাকিস্তানী সেনাদের সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছিল, ভুঁইফোর, যারা গণমানুষের ভাগ্য অস্বীকার করতে চেয়েছিল, তাদের মরণছোবল দেয়ার জন্য অপশক্তিরা গভর্ণর হাউজ এ কাজ করছিল। জেনারেল নিয়াজী তার সাঙ্গ কুখ্যাত মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, এবং তাদের প্রধান সাহায্যকারী মেজর সিদ্দিক সালেক দের সাথে জড়ো হয়ে বসে ছিল। তারা সবেমাত্র একটি তালিকা পেল যা তারা আল-বদর ও আল-শামস-এর কাছ থেকে প্রত্যাশা করছিল। নির্দয় আল-বদর বাহিনীর একজন কমান্ডার আশরাফুজ্জামান খান গভর্নর হাউজ-এর উচ্চ পদস্থদের সুবিধা’র জন্য সবেমাত্র বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। এটা ছিল বুদ্ধিজীবিদের একটি তালিকা যাদের নির্মূল করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল তাঁদেরকে শীঘ্রই হত্যা করা যাতে করে যদি বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাদের কাজ করতে হবে ঐ সমস্ত লোকদের ছাড়া যারা ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিটির কাঠামো পুনর্গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।এটা হত পাকিস্তানীদের বাংলাদেশের প্রতি আংশিক পদাঘাত, তা বলাই বাহুল্য।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের সেই ঘটনাবহুল সপ্তাহের এক মৃত রাতে আশরাফুজ্জামান খানের তালিকার অন্তর্ভুক্ত বহু বাঙালী বুদ্ধিজীবিদের তাঁদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। বলাই বাহুল্য যে, তাঁদের মধ্যে কেউই দিনের আলো দেখার জন্য বেঁচে থাকেননি। এমনকি তাদের পরাজয়ের মুহুর্তেও, জেনারেল নিয়াজী ও রাও ফরমান আলী নিশ্চয়ই এমন চিন্তা উপভোগ করেছিল যে তারা বাংলাদেশকে তার স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত ভারী মূল্য দিতে বাধ্য করেছে। এটা ভাবতে নিশ্চয়ই তাদেরকে কম আনন্দ দেয়নি যে বাংলাদেশ তার এসসম্ত শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবিদের অবদান ছাড়া অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙ্গে পড়বে।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নতুন প্রশাসনের তার কাজে মনোনিবেশ করার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশী সময় লেগেছে। তদন্তকারীরা আশরাফুজ্জামান খানের বাসায় আসার সময়ের মধ্যেই সে পালিয়ে যায়। যাই হোক, তাড়াহুড়ায় সে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ফেলে রেখে যায়। তদন্তকারীরা তার ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজতে গিয়ে তার বাসা থেকে ধাঁধার ঐ অংশটি উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। তারা আশরাফুজ্জামান খানের ডায়েরী খুঁজে পেয়েছিল।সেখানে ছিল তার নিজের হাতে লেখা বুদ্ধিজীবিদের সেই কুখ্যাত তালিকা। এটা ছিল সত্যিই একটি বিভীষিকাময় প্রাপ্তি যা মানুষকে হতবাক করে দিয়েছিল। আশরাফুজ্জামান খান ছিল একজন ফেরারী আসামী। সন্দেহভাজনদের ছবি সকল বাংলাদেশী সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। আসামীদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য জনগণকে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু এসমস্তকিছুই অনেক দেরীতে হয়েছে। আশরাফুজ্জামান তাকে গ্রেফতারের জন্য খোঁজ চলাকালে শুধুমাত্র তার বাসা থেকেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়নি, দেশ থেকেও পালিয়ে যেতে পেরেছিল।

বর্তমানে আশরাফুজ্জামান নিউইয়র্কের সর্বত্র ব্যস্তজীবন অতিবাহিত করছে। সে ঐ শহরের ইসলামিক আন্দোলনের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে।আশরাফুজ্জামান খান বর্তমানে উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সংস্থার সভাপতি। আমার মনে পড়েছে তার ভয়ংকর অতীতের একটি নতুন ঘটনা যখন আমি Washington Post (November 1, 1999) এর একটি সাম্প্রতিক সংস্করণ পড়ছিলাম। এখানে মিশরের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার ব্যাপারে আশরাফুজ্জামান খানের একটি বিবৃতি ছিল। আশরাফুজ্জামান খানের উক্তিতে, “ মাঝে মাঝে আমরা বুঝি যে আমরা অসহায়…….আরেকজন মানুষ তার পিতামাতাকে হারাল। কেউ কিছুই জানেনা। কিন্তু আমাদেরকে আমাদের আল্লাহ্‌র উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।” এই উক্তি সেই মানুষের কাছ থেকে আসছিল যার কুখ্যাত তালিকা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের সেই হতভাগ্য সপ্তাহে বহু অগণিত শিশুদেরকে পিতৃহারা করেছিল। কি দুর্ভাগ্য, এই ষড়যন্ত্রকারী ১৯৭১ সালে বাঙালী বুদ্ধিজীবি হত্যায় দক্ষ ছিল, বর্তমানে একজন পরিপূর্ণ মানবতাবাদী, এতগুলো বছর পরও! কিন্তু, সে কি মানবতাবাদী? না। সে ভেড়ার চামড়ায় একটি নেকড়ে মাত্র। সে এটাই!

(চলবে.......)

সূত্র
আশরাফুজ্জামান খান-এর কুখ্যাত ডায়েরীর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা (শেষ অংশ):

আমরা বাংলাদেশীরা সম্ভবতঃ নিজস্ব যোগ্যতায় স্বকীয়ভাবে বিবর্জিত। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জেনারলে নি্য়াজী ও রাও ফরমান আলীর আত্মসমর্পণের পর বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এবং বর্তমানে শেখ হাসিনাকে মনে হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট নিহত তাঁর আত্মীয়দের হত্যাকারীদের বিচারে বেশী আগ্রহী। ১৯৭১ সালের হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে কারো আগ্রহ দেখা যাচ্ছেনা। আমার কাছে বাংলাদেশের আইনের সবচেয়ে বড় পরিহাস এটাকেই মনে হয়।

অবশ্য আশরাফুজ্জামান খানকে তার অপরাধমূলক অতীতকে তেমনভাবে ভুলতে দেয়া হয়নি। কয়েক বছর আগে ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির আশরাফুজ্জামান খানের অস্তিত্ব প্রকাশ করেন, বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সে কোন খারাপ কাজ করেছে-একথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের তালিকাসম্বলিত বই একাত্তরের ঘাতক দালাল কে কোথায় এর সংস্করণগুলোতে আশরাফুজ্জামান খানের ছবি ও কুখ্যাত ডায়েরীর পাতা শোভা পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সকল রাজ্যে ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির শাখা রয়েছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে এর প্রায় সব সদস্য খুবই তৎপর ছিলেন।তারা এমনকি গোলাম আযম ও তার সাঙ্গদের বিচারের জন্য গঠিত ঐতিহাসিক জনতার আদালতের বিচারকাজে সহায়তা করার জন্য আইনজীবিও প্রেরণ করেছিল।কখন তারা আশরাফুজ্জামান খানের পেছনে ছুটবে? একজন যুদ্ধাপরাধীকে আদালতে জবাবদিহিতায় বাধ্য করা যুক্তরাষ্ট্রে খুব বেশী কঠিন হওয়ার কথা নয়। মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে যে – বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?-ওয়াশিংটন ডি.সি. থেকে লিখেছেন জামাল হোসেন
“Genocide’71 – an account of the killers and collaborators”, ঢাকায় প্রকাশিত, পৃষ্ঠা – ১৮৯ এ আশরাফুজ্জামান খান ( যে বর্তমানে নিউইয়র্কে এবং কুইনস শাখা, ICNA এর সভাপতি)এর অংশ পাওয়া যায়ঃ
একইভাবে সৌদি আরব কিছু সংখ্যক শীর্ষস্থানীয় আল-বদরকে আর্থিকভাবে সাহায্য করে আসছিল। এখানে আমরা আল-বদরের শীর্ষস্থানীয়দের অন্যতম আশরাফুজ্জামান খানের উদাহরণ দিতে চাই। আশরাফুজ্জামান খান ছিল আল-বদর বাহিনীর সরাসরি ঘাতকদের প্রধানদের মধ্যে অন্যতম। এটা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, সে নিজের হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন শিক্ষককে মিরপুরের বধ্যভূমিতে গুলি করে হত্যা করে। জনৈক মফিজুদ্দিন, যে আশরাফুজ্জামানের এসমস্ত অসহায় শিকারদের বহনকারী গাড়ী চালাচ্ছিল, সে আশরাফুজ্জামানকে বুদ্ধিজীবি হত্যার প্রধান ঘাতক হিসেবে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করে।
মুক্তিযুদ্ধের পর আশরাফুজ্জামানের ব্যক্তিগত ডায়েরী তার ৩৫০ নাখালপাড়াস্থ বাসা যেখানে সে থাকত, সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। ডায়েরীর দুইটি পাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯জন শিক্ষকের নাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের বাসার ঠিকানাসহ দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অফিসার মুহাম্মদ মরতুজার নামও এই ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই ২০ জন ব্যক্তির মধ্যে ১৪ই ডিসেম্বর ৮ জন নিখোঁজ হনঃ মুনির চৌধুরী (বাংলা ), ডঃ আবুল খায়ের (ইতিহাস ), গিয়াসউদ্দীন আহমেদ (ইতিহাস), রাশেদুল হাসান (ইংরেজী), ডঃ ফয়জুল মহি (আই.ই.আর ), ডঃ মুনাজা (মেডিকেল অফিসার)।
মফিজুদ্দিনের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায় যে, আশরাফুজ্জামান এসব মানুষদের তার নিজ হাতে গুলি করে। মফিজুদ্দিনের স্বীকারোক্তির কারণে এই সমস্ত হতভাগ্য শিক্ষকদের ছিন্নভিন্ন শরীর রায়েরবাজারের জলাভূমি এবং মিরপুরের শিয়াল বাড়ি গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়। ডায়েরীতে অন্যান্য নামগুলোর মধ্যে এগুলোও ছিলঃ ডঃ ওয়াকিল আহমেদ (বাংলা), ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম (বাংলা), ডঃ লতিফ (আই.ই.আর), ডঃ মনিরুজ্জামান (ভূগোল), কে.এম.সাদউদ্দীন (সমাজবিজ্ঞান), এ.এম.এম. শহীদুল্লাহ্ (গণিত), ডঃ সিরাজুল ইসলাম (ইসলামের ইতিহাস), ডঃ আখতার আহমেদ (শিক্ষা), জহিরুল হক (মনোবিজ্ঞান), আহসানুল হক (ইংরেজী), সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরেজী) এবং কবির চৌধুরী।
ডায়েরীর আরেকটি পাতায় পাকবাহিনীর দোসর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ জন শিক্ষকের নাম ছিল। এছাড়াও বুদ্ধিজীবি হত্যার অপারেশনের প্রধান ব্যক্তি চৌধুরী মঈনউদ্দীন, কেন্দ্রীয় আল-বদর শাখার একজন সদস্য শওকত ইমরান এবং ঢাকার বদর বাহিনীর প্রধানের নামও ডায়েরীতে ছিল।
খুন হওয়া বুদ্ধিজীবিদের নাম ছাড়া ডায়েরীতে অন্যান্য বাঙ্গালীদের নাম-ঠিকানা ছিল। তাঁরা সবাই আল-বদরের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। একটি ছোট্ট কাগজের টুকরোতে পাকিস্তান পাট-বোর্ডের অর্থ সদস্য আবদুল খালেকের নাম, তাঁর বাবার নাম, তাঁর ঢাকার ঠিকানাসহ তার বর্তমান ঠিকানা লেখা ছিল। ১৯৭১ সালের ৯ই ডিসেম্বর, আল-বদর বাহিনী আবদুল খালেককে তাঁর অফিস থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারা ১০,০০০টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। এরপর আল-বদর বাহিনী আবদুল খালেকের কাছ থেকে একটি চিঠি নিয়ে তাঁর বাড়ীতে যায়, যে চিঠিতে তিনি অপহরণকারীদের টাকা দিয়ে দেয়ার জন্য বলেছিলেন। আবদুল খালেকের স্ত্রী ঐ সময়ে ৪৫০ টাকার বেশী দিতে অপারগ ছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে বাকি টাকা তিনি তাদের পরে দিয়ে দেবেন এবং তিনি তাদের অনুরোধ করলেন যেন তাঁর স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু আবদুল খালেক কখনও ফিরে আসেননি।
আশরাফুজ্জামান কিছু সাংবাদিক হত্যার সাথেও জড়িত ছিলেন। পূর্বদেশ পত্রিকার শিফট-ইন-চার্জ ও সাহিত্য সম্পাদক এ.এন.এম. গোলাম মোস্তফাকে আশরাফুজ্জামান অপহরণ করেছিল।
আশরাফুজ্জামান খান ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য ছিল। স্বাধীনতার পর সে পাকিস্তান যায়। বর্তমানে সে রেডিও পাকিস্তানে কর্মরত আছে।
সর্বশেষঃ এই বই প্রকাশের পর থেকে আশরাফুজ্জামান খান নিউ ইয়র্কে চলে যায় এবং বর্তমানে সে উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সংস্থা (ICNA)এর কুইনস শাখার সভাপতি।ডঃ গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শন বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অত্যন্ত সন্মানিত একজন শিক্ষক ডঃ জি. সি. দেব এর পালিত কন্যা বেগম রোকেয়া সুলতানা দ্বারা উদ্বৃত একটি সত্যি ঘটনা,ডঃ জি.সি. দেব ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। ২৫শে মার্চ বাঙ্গালীদের উপর সামরিক জান্তা দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার পরদিন, ছাড়া পাওয়া বেগম রোকেয়া সুলতানা ২৬শে মার্চ ডঃ দেব এর মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যিনি কিছুক্ষণ আগে নিহত হয়েছেন। তাঁর একমাত্র শিশুসন্তান রাবেয়া তখন তাঁর কোলে ছিল। রোকেয়ার স্বামীর নিথর দেহও সেখানে পড়ে ছিল।
সন্তানকে কোলে নিয়ে রোকেয়া বুঝতে পারছিলেননা যে কি করা উচিৎ। ভয় এবং প্রচন্ড আঘাতে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেই কালো, অন্ধকার রাত্রির অনেকগুলো ঘটনার মধ্যে এটি ছিল একটি, যে রাত বাঙ্গালীদের একটি যোদ্ধার জাতিতে পরিণত করেছিল। মৃত্যুর সংজ্ঞা রোকেয়ার কাছে জানা ছিলনা। কিন্তু তিনি ২৫শে মার্চের সেই চরম কালো রাত্রির একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। ২৬শে মার্চের ভয়াবহতার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল যা শুধুমাত্র একজনের শেষমুহুর্তগুলোর সাথেই তুলনাযোগ্য। ২৬শে মার্চ সকালে ডঃ গোবিন্দ চন্দ্র দেব এলোপাথারি গুলির কারণে রোকেয়ার চোখের সামনেই পড়ে যান। মৃত্যুর কিছু সময় পূর্বে তিনি তাঁর শিশুসুলভ সারল্যতায় পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে বাবা (পুত্রতুল্য সম্বোধন) বলে সম্বোধন করছিলেন। তিনি তাঁর বাসায় তাদের আচমকা অভিযানের কারণ জানতে চেয়েছিলেন। এই নিষ্ঠুরতা ঘটানোর পেছনে রোকেয়া কোন প্রাসঙ্গিক কারণ খুঁজে পাননি।
মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় ড. দেব শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেননা। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পায়ে ব্যাথা নিয়ে ফিরে আসেন। মার্চে তিনি দাঁতের ব্যাথায় ভুগছিলেন। ব্যাথাটি এমনকি তাঁর কন্ঠনালীতেও ছড়িয়ে পড়ে। ড. দেব সাধারণত রাজনীতি বিষয়ক কোন আলোচনায় অংশ নিতেন না, কিন্তু মার্চের অসহযোগ আন্দোলন মাঝে মাঝে তাঁকে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন করে তুলত। বাংলা শব্দ মুক্তি তাঁর কাছে বিশেষ অর্থ বহন করত। ২৩শে মার্চ যখন প্রাক্তন ছাত্রনেতা মরহুম আবদুল কুদ্দুস মাখন ড. দেব এর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, ড. দেব তাঁকে (মাখনকে) স্বাধীন বাংলার পতাকা কেনার জন্য স্বেচ্ছায় টাকা দিয়েছিলেন। পরে তিনি বলেছিলেন, এবার দেশের জন্য অর্থবহ কিছু হবে।
২৫শে মার্চ তিনি প্রতিদিনের মত সান্ধ্যকালীন ভ্রমণে বের হন। রাত ৮টায় বাসায় ফেরার পর তিনি তাঁর রিডিং রুমে প্রবেশ করেন। রোকেয়া তাঁকে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে বলেছিলেন কারণ তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেননা। তাঁর (রোকেয়া) স্বামী মরহুম মোঃ আলী ছিলেন একজন ব্যাংকার। তিনি তাঁর বি.এড. পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সারাদিনের কাজের পর তাঁর স্বামী এবং ড.দেব ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
তখন রাত ১১টা। ক্রমাগত গুলির আওয়াজ রোকেয়াকে চমকে দিল। ভয় পেয়ে তিনি তাঁর স্বামীকে ডাকলেন। সেসময় তাঁরা জগন্নাথ হল এলাকায় বসবাস করতেন। রোকেয়াদের কক্ষ ছিল এক কোণায় এবং ড.দেবের কক্ষ ছিল বাড়ীর মাঝখানে। মোঃ আলী গুলির শব্দে জেগে উঠলেন। তাঁদের কাছে সেটাকে ভূমিকম্পের মত মনে হল। বুলেট ঝড়ের মত বাড়ীটিকে আঘাত করছিল। পুরো বাড়ী কাঁপছিল। মোঃ আলী এবং রোকেয়া তাঁদের শিশুসন্তানসহ মাঝখানের কক্ষে হামাগুড়ি দিয়ে চলে এলেন। ড.দেব ভয় এবং আতংকে থরথর করে কাঁপছিলেন। সন্তানকে মোঃ আলীর হাতে দিয়ে রোকেয়া ড.দেবকে জড়িয়ে ধরলেন। গভীর রাতে এত বেশী গোলাগুলি হচ্ছিল যে, তাঁদেরকে বাড়ীর একটি ছোট্ট কক্ষে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। পাকিস্তানী সেনারা লাউডস্পীকারের মাধ্যমে তাঁদেরকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিচ্ছিল। তারা ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করছিল। ভোর নাগাদ গুলির শব্দ প্রায় থেমে এসেছিল। সারারাত জেগে থেকে ড.দেব খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি প্রায় ধরাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। চরম ক্লান্তি ও পরিশ্রান্তি সত্ত্বেও তিনি রোকেয়াকে বললেন, “মা, এখন প্রার্থনার সময়। তুমি কি আমাকে তার জন্য একটা জায়গা দেবে?” গুলির শব্দ তখন আর ছিলনা। রোকেয়া মাঝখানের ঘরটি পরিষ্কার করে দিলেন ড.দেবের প্রার্থনার জন্য। পাকিস্তানীদের লাগামহীন উন্মত্যতার কারণে পুরো বাড়ীটি এমনভাবে অগোছালো হয়ে পড়েছিল যে, এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে হেঁটে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দেয়ালে অসংখ্য গর্ত হয়েছিল। দেয়ালের পলেস্তারা খসে আসছিল। মনে হচ্ছিল বাড়ীটি যেকোন মূহুর্তে ভেঙ্গে পড়বে।
মোঃ আলী সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় পড়েছিলেন। ফ্লাস্কে রাখা গরম পানি দিয়ে কোনরকমে এক কাপ চা বানিয়ে রোকেয়া ড.দেবের কক্ষে নিয়ে গেলেন। তিনি চা পান করার পর স্বস্তি অনুভব করলেন।
পাকিস্তানীদের দ্বারা সংঘটিত উন্মত্ততার বর্ণনা দেয়ার সময় রোকেয়াকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সেটি তাঁর জীবন – বাংলাদেশীদের প্রত্যেকের জীবনে একটি অভিশপ্ত মূহুর্ত ছিল। তিনি বললেন, তাঁর সন্তানও দেখেছে কিভাবে তাঁর পিতামহ নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন। দখলদার শক্তিরা ড.দেবকে শিশুটির সামনে হত্যা করে। “নির্মম সেই হত্যাকান্ডের স্মৃতি এখনও আমার কন্যার মনে জ্বলজ্বল করছে”- এটি মনে করে তিনি (রোকেয়া) ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। “সেটা ছিল ২৬শে মার্চের সেই অভিশপ্ত সকাল। পুরো জগন্নাথ হল এলাকা সৈন্যতে পরিপূর্ণ ছিল। আগের রাতে হত্যা করা লাশগুলো ডরমিটোরী বিল্ডিংয়ের সামনে পড়েছিল। নির্যাতিত মহিলাদের আর্তনাদের আওয়াজ আশেপাশের এলাকা থেকেও শোনা যাচ্ছিল। কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থায় আমরা সবাই বাড়ীর মাঝখানের কক্ষে জড়ো হলাম। কিছুক্ষণ পর সদর দরজায় কড়াঘাতের শব্দ এল। কেউ চিৎকার করে বলছিল, “মালাউন কি বাচ্চা, দারওয়াজা খোল দো।” সেটা আদেশ ছিলনা। সেটাকে বর্বর ব্যক্তির গর্জন বলে অনুভূত হচ্ছিল। ভয় পেয়ে ড.দেব সন্ত্রস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। রোকেয়া তাঁকে জোর করে বসিয়ে দিলেন। দরজায় কড়াঘাতের আওয়াজ ক্রমাগত বাড়তে লাগল। মনে হচ্ছিল তারা তাদের বুটজুতা দিয়ে দরজায় লাথি মারছিল। দরজাটি প্রায় ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।”
শিশুটিকে ড.দেবের কোলে রেখে রোকেয়ার স্বামী দরজার দিকে হেঁটে গেলেন। দরজাটির নির্মম আঘাতের সামনে স্থির থাকার উপায় ছিলনা। তিনি দরজার কাছে পৌঁছামাত্রই সেটি ভীতসন্ত্রস্ত বৃদ্ধের উপর ধ্বসে পড়ল। ড.দেব কোনরকমে ধ্বসে পড়া দরজা থেকে বের হয়ে আসতে সমর্থ হলেন। সাথে সাথে এক সৈনিক রাইফেল দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করল। দূর থেকে একটি গুলি তাঁর বুকে আঘাত করল। তিনি সেখান থেকে সরে আসতে চাইলেন। কয়েক কদম পরেই তিনি মেঝেতে পড়ে গেলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা মাঝের কক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখানে মাত্র তিনজন – ড.দেব, শিশুটি এবং রোকেয়া ছিলেন। ড.দেব এতই স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি আক্রমণকারীদের শান্তভাবে “তোমরা এখানে কি চাও বাবা?” জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারলেননা। এটা ছিল তাঁর শেষ উক্তি। এর জবাবে তারা তাঁর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করল। দুটি বুলেট তাঁর মাথায় ঠিক একটি কানের কাছে এবং অন্য গুলিগুলো তাঁর বুকে আঘাত করল। তারা রোকেয়াকেও নির্মমভাবে প্রহার করছিল। তারা বারবার ঘরের কোথায় রাইফেলগুলো আছে জানতে চাচ্ছিল। তারা বারবার ড.দেবের মৃতদেহে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করছিল। সেটা ছিল একটি ভয়ংকর দৃশ্য। রোকেয়া মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লেন যে, তিনি শিশুটিকে তাঁর আরো কাছে টেনে “আল্লাহ্‌” বলে চিৎকার করছিলেন। তিনি এখনও জানেননা যে ঐ চিৎকারের কারণে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন কিনা। পাকিস্তানীরা ড.দেব এবং তাঁর স্বামী মো.আলীর মৃতদেহ নিয়ে গেল এবং জগন্নাথ হলের খেলার মাঠে শত শত লাশের মাঝে রাখল। এই নির্মম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের একজন প্রাণপ্রিয় শিক্ষক ও দার্শনিকের জীবনাবসান ঘটল।
ডঃ জ্যেতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজী বিভাগ) (প্রথম অংশঃ)

“আমার বাবা শহীদ বুদ্ধিজীবি জ্যেতির্ময় গুহঠাকুরতার স্মৃতি, যিনি পাকিস্তানী সেনাদের হাতে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিহত হন” – মেঘনা গুহঠাকুরতা
হে বাবা!
যখন আমি ফিরে তাকাই বাগানের চারাগাছ, শীতকালীন ডালিয়া ফুলগুলোর দিকে, আমি আমার শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে যাই। দক্ষিণ এশিয়ার শুষ্ক শীতের সকালের বুনো এই রঙগুলোর মাঝে আমি বাবাকে গাছের মরা প্রশাখাকে ছেঁটে ফেলতে, কন্টকময় গোলাপের গুচ্ছ থেকে মরা পাতা তুলে ফেলতে এবং রডোডেনড্রন ফুলের পাতা তুলতে দেখতে পাই। বাগানটি ছিল আমার বাবার প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্র। তিনি নিজেকে গর্বভরে প্রধান বাগান সংরক্ষণকারী ও তাঁর রাজ্যের রাজা হিসেবে দাবী করতেন, এবং কেউ কোন অবস্থাতেই সেখানে অবস্থিত যেসব ফুল বা চারাগাছের নাম জানত না এবং যাদের কাছে দেয়ালের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন প্রকার জেসমিন ফুলের নিগূঢ় সুগন্ধের কারণে অস্পৃশ্য অথবা সূর্যাস্তে পরিবর্তনশীল অসাধারণ বর্ণচ্ছটার সাথে সংবেদনহীন ছিল, তারা বাগানটিতে প্রবেশে সাহস করতো না। আমার প্রথম দিককার স্মৃতিতে আমি দেখতাম একদল উদ্বিগ্ন কিন্তু অধীর আগ্রহী ছাত্ররা দলবেঁধে আমাদের বাড়ীতে আসত এবং সতর্ক পায়ে হেঁটে হেঁটে আমার বাবার পদচিহ্নের কাছাকাছি তাঁর রাজ্যের ভেতরে আনাগোনা করত। তারা ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র ছিল যাদের Keats and Wordsworth এর কবিতায় সমস্যা হচ্ছিল, বাবার দরজার সামনে পৌঁছাল, তারা আরো বেশী জানার ব্যাপারে তৃষ্ণার্ত ছিল। কিন্তু তারা কি আসলেই জানত তাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে!!! প্রথমেই তাদেরকে উজ্জ্বল সূর্যালোকের মাঝে বিভিন্ন রকমের সবুজকে আলাদা করার ক্ষমতা দেখাতে হয়েছিল। তারপর আশেপাশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চারা পরিচর্যা করার সময় পৃথিবীর আচরণ এবং বাড়ন্ত চারাগাছের কিভাবে পানির প্রয়োজন সেসম্পর্কে তাদের গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল। তারপর এটা অবশ্য পালনীয় ছিল যে উজ্জ্বল বেগুণী, হলুদ, গোলাপী এবং লাল রঙগুলোকে সংগঠিত করা যাতে করে এগুলো ভয়াবহভাবে সাংঘর্ষিক না হয় বরং চারিদিকে আনন্দদায়ক সুর প্রবাহিত করে।
এবং সাহিত্যের, ইংরেজীর, বাংলার প্রতিটি পাতার শিক্ষায় অথবা জীবনে যা কিছুই্ ছাত্রদের জীবনে আসুক, ছাত্ররা আচমকাই তাদের শরীরে রবীন্দ্রনাথ, ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং ইয়েটসের কবিতার আমার বাবার আবৃত্তির শব্দ কম্পন সৃষ্টি করত।
বাগান করা নিয়ে আমার বাবার শখ শুধু সর্বজন বিদিতই ছিলনা, তা ছিল বিখ্যাত। একবার চারিদিকে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, কলেজের পরীক্ষার জন্য ইংরেজীর প্রশ্ন করার জন্য তাঁকে বলা হয়েছিল। এসব তরুণ পরীক্ষার্থীরা কি ধরণের রচনা পরীক্ষায় আসবে সে ব্যাপারে সাজেশন পাওয়ার জন্য বাবার অনেক ছাত্রদের খাওয়াদাওয়া করাতো। বাবার ছাত্ররা তাদের শ্রমের কারণে ভালভাবে আপ্যায়িত হয়ে একটি সচরাচর কথা বলত, এটা(রচনার বিষয়) অবশ্যই বাগান করার শখ হতে হবে! উল্লাসিত পরীক্ষার্থীরা তাদের মধ্যরাতের তেলের কুপিতে গিয়ে বাগান করার পদ্ধতির সকল দুঃসাধ্য ব্যাখ্যাগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত। কিন্তু হায় তাদের বিস্ময়ের সীমা থাকল না যখন তারা পরদিন সকালে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে তাদের মুখের সামনে শখ হিসে মাছ ধরা সম্বন্ধে রচনা লিখতে বলা হল। বোকা বনে যাওয়া ছাত্ররা যখন আমার বাবাকে একটি ভুল রচনার জন্য রাক্ষসের মত রাতের খাওয়ার কাহিনীটি বলল, তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন কিন্তু তাঁর চোখ উজ্জ্বল বর্ণের ডালিয়া ফুলের মত সংগোপনে মিটমিট করছিল।
ত্ডঃ জ্যেতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজী বিভাগ) (দ্বিতীয় অংশঃ)
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের হতভাগ্য রাতের মাত্র নয়মাস আগে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেয়া নতুন আবাসে স্থানান্তরিত হই। বাড়ীটি ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ঠিক বিপরীতে এবং ছাত্রদের আবাসিক হল জগন্নাথ হল, যার প্রভোস্ট নিযুক্ত করা হয় আমার বাবাকে - তার পূর্ব দিকের রাস্তার ধারে। আমার বাবা সবসময় চাইতেন নিচের তালার বাড়ী যাতে করে তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলো করতে পারেন। আমাদের স্থানান্তরিত হওয়া ফ্ল্যাটটির পেছনের দিকটা ছিল ক্রমাগত জমে ওঠা ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ যা বাগানে রুপান্তরিত হওয়ার আগে অনেক কাজ করার ছিল। কিন্তু এটা ছিল একটা চ্যালেঞ্জ যা আমার বাবা গ্রহণ করেছিলেন ঐ স্থানে প্রবেশ করার পর থেকেই। ১৯৭০ সালের শীতের ভেতরেই অবাঞ্চিত গাছড়া পরিষ্কার করা হল, পুরো মাটি খোঁড়া হল এবং বালু ও কাদামাটির মিশ্রণ তার ওপর দেয়া হল যা একটি খাঁটি সবুজের আঙ্গিনার জন্ম দিতে পারে। বিছানাগুলোও বিস্কিট, লেবু, গোলাপী ও গাঢ় খয়েরী – প্রভৃতি বিভিন্ন বর্ণের রৌদ্রজ্বল গাঁদাফুল ও ডালিয়া ফুলের জন্য প্রস্তুত ছিল। এতে করে অনেক পথচারী থমকে দাঁড়াতো এবং দেয়ালের এই দৃশ্যের দিকে তাকাতো এবং আমার বাবার মুখমন্ডল একটা উজ্জ্বল ডালিয়া ফুলের মত গর্ব সহকারে আলোকরশ্মির মত উজ্জ্বল হতো।
কিন্তু হায় সেটা ছিল ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের হতভাগ্য সেই রাত যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সৈন্যরা তাদের অপারেশন সার্চলাইট মিশনে এই অমূল্য বাগানকে পদদলিত করল এবং মূল দরজা অতিক্রম করল অধ্যাপক -এর খোঁজে। এটা ছিল সেই ভালোবাসার আ্ঙ্গিনা যেখানে বাড়ীর সন্মুখদিকে তাঁকে বন্দুকের মুখোমুখি করা হয়েছিল এবং তাঁর নাম ও ধর্ম বলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আমার বাবা উত্তর দেয়ার সাথে সাথেই গুলি করার আদেশ দেয়া হল। বাবা মুখ ঘুরিয়ে ফেলার সময় ঘাড়ে আঘাত পেলেন এবং একবার তাঁর কোমড়ে যা তাঁকে কোমড়ের নিচের অংশকে অবশ করে ফেলেছিল। তিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। সৈন্যরা দল নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে ক্যাম্পাসের অন্যান্য জায়গায় তাদের দায়িত্ব পালন করতে লাগল যেখানে নরকের পরিবেশের উদ্ভব হয়েছিল। তিনি চেতনা ফিরে পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি আমাদের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন। আমরা বুঝতে পারলাম কি ঘটেছিল, যতক্ষণে আমরা ধরতে পারলাম যে তাঁকে গ্রেফতার করে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রতিবেশীরা তাঁকে বাড়ীতে আনার জন্য আমাদের সাহায্য করল, কিন্তু দুই রাত এবং দুই দিন আমরা তাঁকে কোন চিকিৎসা দিতে পারলামনা। সেনাবাহিনীর গাড়ী টহলে ছিল, এবং ডানে-বামে গুলিবর্ষণ হচ্ছিল। এরই মধ্যে সৈন্যদের একটি দল এসে মৃতদেহ সংগ্রহ করে জগন্নাথ হলে খোঁড়া গণকবরে সমাহিত করার জন্য নিয়ে গেল। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান এবং তাঁর পরিবারের তিন ছেলে সবাই সেদিন রাতে গুলিতে নিহত হন এবং তারা তাঁদের দেহগুলো আমাদের তৃতীয় তলায় বসবাসকারী পরিবারের কাছ থেকে টেনে নিয়ে গেল। তারা আমার বাবার শরীর গুণতে ভুলে গেল। আমরা ২৭ তারিখ ভোরেই কার্ফিউ ভাঙার পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলাম। তিনি দুর্বল ছিলেন কিন্তু তাঁর জ্ঞান ছিল। কিন্তু ডাক্তাররা বললেন তাঁর দিন ফুরিয়ে আসছে। আঘাতটা খুবই মারাত্মক ছিল। তিনি ১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ সকাল ১০টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ ক
http://www.somewhereinblog.net/blog/nayeemewudhkblog/29289639
Admin
Admin
এডমিন
এডমিন

পোষ্ট : 811
রেপুটেশন : 41
নিবন্ধন তারিখ : 19/11/2010

http://melbondhon.yours.tv

Back to top Go down

Back to top


 
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum