Melbondhon
এখানে আপনার নাম এবং ইমেলএড্রেস দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন অথবা নাম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন
widgeo

http://melbondhon.yours.tv
CLOCK
Time in Kolkata:

নীরক্তকরবীর মালা -কনক জ্যোতি মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বঙ্গীয় আদি উৎসের সন্ধানে-

Go down

নীরক্তকরবীর মালা -কনক জ্যোতি মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বঙ্গীয় আদি উৎসের সন্ধানে-  Empty নীরক্তকরবীর মালা -কনক জ্যোতি মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বঙ্গীয় আদি উৎসের সন্ধানে-

Post by mahdi briged on 2011-06-27, 06:57

মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা
ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে গভীর পাঠে মনোনিবেশ করেছি। হঠাৎ হঠাৎ ঢাকায়
বসে কোনও কোনও শ্রীমান ও শ্রীমতি (জনাব লিখলাম না; লিখলে
মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শব্দ ব্যবহারের অভিযোগ করবেন তারা) তীব্র চিৎকার করে
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা নিপাতের
হাঁক-ডাক দেন। ভাবলাম, পরের মুখে ঝাল খেয়ে কী লাভ! নিজে অধ্যয়ন করে দেখি,
বঙ্গদেশে মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বস্তুর আদি উৎস বা
আসল অবস্থান কোথায়। শ্রীমান-শ্রীমতীগণ অবশ্য পরের মুখের ঝালই শুধু নয়, সব
কিছুই খান; হিন্দু স্বামী গ্রহণ করেন; কলকাতায় গিয়ে কথা ও কাজে ‘তাদের মতো
হতে পারলে ভালো হতো'--এমন ভাব করেন; বাঙালি-বাঙালি বলে ‘তাদের' সংস্কৃতি
প্রতিষ্ঠার জন্য অহর্নিশি কাজ করেন। এসব বড় বড় কাজ (পড়ুন ‘কুকাজ')
শ্রীমান-শ্রীমতীগণ করেন আধুনিকতা, মুক্তচিন্তা, প্রগতিশীলতা, ব্যক্তি
স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের নাম করে। সংখ্যায় তারা খুবই কম হলেও আওয়াজে
ওস্তাদ; তাদের ঢাক একই সঙ্গে ঢাকা-কলকাতায় বাজে। এতো বেশি মিডিয়ায় আসেন যে,
খলনায়ক-খলনায়িকাদের চেয়েও এদেরকে মানুষ বেশি চেনে। অতএব এসব জনপ্রিয়ের (!)
নতুন করে পরিচয় দেয়ার দরকারই হয় না।
ভাবলাম মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি সম্পর্কে ইতিহাস থেকে
তথ্য সংগ্রহ করি। তখনই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের একটি ঘটনা সামনে চলে এলো।
কাকতালীয়ভাবে ঘটনাটি ঘটেছিল আজকের তারিখ (২৭ জুন) থেকে দুই দিন পরে, ২৯
জুন। সালটি ছিল ১৮৭৩, বিশিষ্ট কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুর দিন।
ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সেই নোংরা চিত্রটি হাল আমলের তথাকথিত
মৌলবাদ-ধর্মান্ধতা-সাম্প্রদায়িকতা বিরোধীরা জানে বলে মনে হয় না। জানলে,
মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতার নামে তারা কেবলমাত্র ইসলাম,
মুসলমান ও ইসলামী আন্দোলনকে আক্রমণের জন্য ভাড়া করা পেয়াদার মতো ঝাঁপিয়ে
পড়তো না। বিলক্ষণ বুঝলাম, এদের মতলব ভালো নয় ও এদের ইতিহাসবোধ নেই। এরা
প্রকৃত ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদকে চিহ্নিত ও সনাক্ত করতে অক্ষম। এদের
লাফ-ঝাঁপগুলো বানোয়াট এবং এরা আসলে জল ঘোলা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এরা
মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির ধুঁয়া তুলে বিভ্রান্তি ছড়াতে
চায়। এদের জন্য এবং এদের দ্বারা বিভ্রান্তদের জন্য ইতিহাসের আদি ঘটনাটির
বিস্তারিত উল্লেখ করছি। তাতে যদি এদের কিছুটা হলেও জ্ঞান হয়; কিছুটা হলেও
ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি আনুগত্য আসে এবং জাতি-ধর্মনাশী বদ-কাজ থেকে নিবৃত্ত
হয়ে এককভাবে মুসলমান ও ইসলামকে আঘাত করার পাপ থেকে বিরত হয়।
ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে, ১৮৭৩ সালের মার্চ মাস নাগাদ কবি মাইকেল মধুসূদন
দত্তের স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়ে। তাঁর স্ত্রী হেনরিয়েটার স্বাস্থ্যও
নাজুক অবস্থার সম্মুখীন হয়। অপরিমিত মদ্যপান, চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় ছেদ,
অমিতচারিতার ফল শরীর সইতে পারে নি। উত্তরপাড়া লাইব্রেরির ওপর তলায় আশ্রয়
পেলেন কবি। রইলেন ছয় সপ্তাহ। উত্তরপাড়ায় কবির শরীর-স্বাস্থ্য ও কার্যকলাপের
যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে তাঁর উচিত ছিল, পাঠগৃহে নয়, চিকিৎসাস্থল
আলিপুরের জেনারেল হাসপাতালে যাওয়া। কারণ, এ সময়ে তিনি এবং হেনরিয়েটা উভয়েই
খুব অসুস্থ ছিলেন। কে বেশি অসুস্থ বলা মুশকিল হলেও সুস্থতা দু'জনের ধারে
কাছেও ছিল না। এই সঙ্কুল সময়ে মাইকেল আরাম কেদারায় বসে চোখ বুজে পড়ে
থাকতেন। দেখলে মনে হতো, যেন একটি কঠিন হিসাব মেলাতে চেষ্টা করছেন। হায়! কী
আশা করেছিলেন আর কী অর্জন করেছিলেন! সম্ভবত এ কারণেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের
একমাত্র প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থের নাম তাঁর জীবনেরই মতো এবং তাঁর কবিতার
উদ্ধৃতির মাধ্যমে বিধৃত : ‘আশার ছলনে ভুলি', যার লেখক গোলাম মুরশিদ।
মাইকেল যখন নিদারুণ অসহায় অবস্থায় উত্তরপাড়ায় বসবাস করছেন, তখন হাওড়ায়
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলী হয়ে আসেন মাইকেল-বন্ধু গৌরদাস বসাক। তিনি
এ সময়ে একাধিক বার উত্তরপাড়ায় গিয়ে মাইকেলকে দেখে আসেন। শেষবার সেখানে
তিনি যে দৃশ্য দেখতে পান, স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি তার বিবরণ দিয়েছেন
এইভাবে : ‘‘মধুকে দেখতে যখন শেষবার উত্তরপাড়া সাধারণ পাঠাগারের কক্ষে যাই,
তখন আমি যে মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখতে পাই, তা কখনো ভুলতে পারবো না। সে
সেখানে গিয়েছিল হাওয়া বদল করতে। সে তখন বিছানায় তার রোগযন্ত্রণায়
হাঁপাচ্ছিল। মুখ দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছিলো। আর তার স্ত্রী তখন দারুণ জ্বরে
মেঝেতে পড়েছিলো। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে মধু একটুখানি উঠে বসলো। কেঁদে ফেললো
তারপর। তার স্ত্রীর করুণ অবস্থা তার পৌরুষকে আহত করেছিলো। তার নিজের কষ্ট
এবং বেদনা সে তোয়াক্কা করে নি। সে যা বললো, তা হলো : ‘afflictions in
battalions.’ আমি নুয়ে তার স্ত্রীর নাড়ী এবং কপালে হাত দিয়ে তাঁর উত্তাপ
দেখলাম। তিনি তাঁর আঙুল দিয়ে তাঁর স্বামীকে দেখিয়ে দিলেন। তারপর গভীর
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নিম্নকণ্ঠে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। বললেন : ‘‘আমাকে দেখতে
হবে না, ওঁকে দেখুন, ওঁর পরিচর্যা করুন। মৃত্যুকে আমি পরোয়া করিনে।’’
বাল্যবন্ধুর অন্তিম দশা দেখে গৌরদাস স্বভাবতই বিচলিত বোধ করেন। তিনি তাঁকে
উন্নত চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইলেন। জানা গেল, পরের
দিন, ২০/২১ জুন (১৮৭৩), মধু নিজেই কলকাতা ফেরার ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
সপরিবারে কবি বজরায় করে নৌপথে নির্ধারিত দিনে অসুস্থ শরীরে নিজ উদ্যোগেই
কলকাতা যাত্রা করলেন।
কলকাতায় হেনরিয়েটাকে ওঠানো হলো তাঁর জামাতা উইলিয়াম ওয়াল্টার এভান্স
ফ্লয়েডের বাড়িতে, ১১ নম্বর লিন্ডসে স্ট্রিটে। ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান
পাড়া লিন্ডসে স্ট্রিট চৌরঙ্গি রোডের সঙ্গে সংযুক্ত। স্ত্রীর সংস্থান হলেও
মাইকেলের নিজের ওঠার মতো কোনও জায়গা ছিল না। উত্তরপাড়ায় যাবার আগেই তিনি
তাঁর এন্টালির বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন। অগত্যা মাইকেল ঠাঁই নিলেন আলিপুর
জেনারেল হাসপাতালে। সে আমলে দেশীয় ভদ্রলোকগণ হাসপাতালে ভর্তি হওয়াকে
কালাপানি পার হওয়ার মতো শাস্ত্রবিরুদ্ধ একটি অসাধারণ ব্যাপার বলে বিবেচনা
করতেন। ফলে এই হাসপাতালটি ছিল মূলত বিদেশী এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য
সংরক্ষিত। কিছু বিশিষ্টজনের তদবিরে এবং মাইকেলের নিজের সাহেবী পরিচয়ের জন্য
তিনি অবশেষে এ হাসপাতালে ভর্তির অনুমতি পেলেন। হাসপাতালে আসার পর প্রথম
দিকে শুশ্রূষা এবং&ওষুধপত্রের দরুন তাঁর রোগ লক্ষণের খানিকটা উপশম
হয়েছিল। কিন্তু অচিরেই তাঁর স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতির দিকে এগিয়ে যায়। যকৃৎ,
প্লীহা এবং গলার অসুখে তাঁর দেহ অনেকদিন থেকেই জীর্ণ হয়েছিল। হাসপাতালে
ভর্তি হওয়ার সময়েই তাঁর যকৃতের সিরোসিস থেকে দেখা দিয়েছিল উদরী রোগ। সেই
সঙ্গে হৃদরোগের লক্ষণও স্পষ্ট দেখা দেয়। সব মিলিয়ে তাঁর শরীর শেষ অবস্থায়
এসে উপনীত হয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের আদিপর্বে একজন ‘সাহেব-কবি' অকৃপণভাবে মধুভান্ড তৈরি
করেছিলেন, যার স্বাদ পুরোপুরিভাবে তাঁর স্বজাতি গ্রহণ করতে অক্ষম হয়েছিল।
বরং অবজ্ঞা ও সমালোচনায় ‘জাত-ত্যাগী' কবিকে ভৎর্সনা করেছিল। সেই
মধুনির্মাতা মধুকবি মারা যাচ্ছেন শুনে আলিপুর হাসপাতালে অনেকের ভিড় দেখা
যায়। তাঁর চরম দুরবস্থার খবর শুনেও এতো দিন যারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল, তারাও
এসে হাজির। রক্তের আত্মীয়তা সত্ত্বেও যারা একদা তাঁকে ধর্মের কারণে ত্যাগ
করেছিল, তাদের মনেও হয়ত করুণা বা লোকলজ্জা হানা দিয়েছিল-তারাও এলেন। কবি
তখন ভালো করেই অনুভব করতে পারছিলেন যে, তিনি মারা যাচ্ছেন; তবে ভালো হয়ে
উঠবেন-এই স্বপ্নও তিনি দেখছিলেন। এরূপ বিপন্ন অবস্থাতেও তিনি বেহিসাবী
স্বভাবের প্রভাবমুক্ত হতে পারেন নি। ধার করে হলেও ব্যয় করার এবং বদান্যতা
দেখানোর প্রবণতা তিনি এ সময়েও ত্যাগ করতে পারেননি। হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে
একদিন দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর এক সময়ের মুন্সি মনির উদ্দিন। কবির কাছে
তাঁর চার শ' টাকা পাওনা ছিল। তারপরেও উল্টো কবি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কোনও
টাকা পয়সা আছে কি-না? মনির উদ্দিন তাঁর কাছে মাত্র দেড় টাকা আছে বলে
জানালেন। সেই পয়সাই তিনি চাইলেন। তারপর তা বকশিস হিসাবে দান করলেন তাঁর
শুশ্রূষাকারিণী নার্সকে। মৃত্যুকালেও ধার করে বকশিস দেবার এই আচরণ সম্পূর্ণ
সঙ্গতিপূর্ণ তাঁর সারা জীবনের অভ্যাসের সঙ্গে।
কবি হাসপাতালে ছিলেন সাত অথবা আট দিন। এ সময়ে কিছু চিকিৎসা ও সেবা-যত্ন
পেলেও কবি খুব একটা মানসিক শান্তিতে ছিলেন না। পরিবার সম্পর্কে তাঁর
দুশ্চিন্তা এবং হেনরিয়েটার স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাঁর উদ্বেগ তাঁকে বিচলিত
করে। এরই মাঝে হাসপাতালের শয্যায় শায়িত চরম অসুস্থ কবি এক পুরনো কর্মচারীর
মাধ্যমে ২৬ জুন (১৮৭৩) একটি মর্মান্তিক বেদনার খবর পেলেন-স্ত্রী হেনরিয়েটার
মৃত্যুর সংবাদ। মাত্র ৩৭ বছর ৩ মাস ১৭ দিন বয়সে হেনরিয়েটা মারা গেলেন।
হেনরিয়েটা বয়ঃসন্ধিকালে মা মারা যাবার পর থেকে সুখের মুখ কমই দেখেছিলেন।
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিত পরিবেশ ত্যাগ করে তিনি মাদ্রাজ থেকে
কলকাতা এসেছিলেন মাইকেলের ভালোবাসার টানে। চার্চে গিয়ে সেই ভালোবাসার কোনও
স্বীকৃতি পর্যন্ত তিনি আদায় করতে পারেন নি। এমন প্রেয়সীর মৃত্যু সংবাদ কবির
কাছে প্রচন্ড আঘাত হয়ে এসেছিল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাইকেলের মুখ থেকে
প্রথম যে কথাটি বের হয় : ‘‘বিধাতঃ, তুমি একই সঙ্গে আমাদের দু'জনকে নিলে না
কেন?' হেনরিয়েটার শর্তহীন ভালোবাসা এবং নীরব ত্যাগের কথা অন্য সবার চেয়ে
মাইকেলই ভালো করে জানতেন। সুতরাং যতো অনিবার্য হোক না কেন, হেনরিয়েটার
প্রয়াণে মৃত্যুপথযাত্রী কবি খুবই মর্মাহত ও বিষণ্ণ হয়েছিলেন। এর ফলে তাঁর
অসহায়ত্ব ও যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি খুবই ব্যাকুল হয়ে ওঠেন
হেনরিয়েটার শেষকৃত্যের ব্যাপারে। এর জন্যে যে অর্থ, যোগার-যন্ত্র লাগবে, তা
কোথা থেকে আসবে ? তিনি সঞ্চয়ী লোক ছিলেন না। কপর্দকশূন্য অবস্থায় স্ত্রীর
মৃত্যুতে মাইকেল তখন নিজেও মৃত্যুপথযাত্রী।
এই দিনই অথবা পরের দিন হাসপাতালে শয্যাগত মাইকেলের কাছে স্বজন মনোমোহন ঘোষ
আসেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ও সান্ত্বনা দিতে। কবি তাঁকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা
করেন, ঠিকমতো হেনরিয়েটার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়েছে কিনা। মনোমোহন জানালেন,
সবই যথারীতি হয়েছে। মাইকেল জানতে চান, বিদ্যাসাগর ও যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর
এসেছিলেন কিনা। মনোমোহন জানালেন, এঁদের খবর দেওয়া সম্ভব হয় নি; অর্থাৎ
আসেননি। স্ত্রী বিয়োগের ফলে অসহায় কবির সামনে আরেকটি মারাত্মক উদ্বেগের
কারণ এসে উপস্থিত হয়: দুই পুত্রের ভবিষ্যৎ চিন্তা। তাঁর পুত্রদের একটির বয়স
তখন মাত্র বারো এবং অন্যটির মোটে ছয়।
ধর্মান্তরিত মাইকেলের অবস্থা এমন ছিল যে, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন
বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রেভারেন্ড চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বরং কবির পারলৌকিক
মঙ্গল নিয়ে কবির চেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। বিশেষত চন্দ্রনাথ কবিকে এ সময়ে
বার বার নাকি পরম ত্রাতা যীশুখৃস্টের কথা মনে করিয়ে দেন। মাইকেল জীবনীকার
গোলাম মুরশিদ লিখেন : ‘‘পারলৌকিক মঙ্গলের ব্যাপারে তাঁদের এই উৎকণ্ঠা দিয়ে
নিজেদের অজ্ঞাতে তাঁরা কবির প্রতি যথেষ্ট নিষ্ঠুরতা করেন বলেই মনে হয়।’’
২৮ জুন তারিখে সমস্ত আশা-ভরসাহীন, রোগকাতর, বিষণ্ণ কবি যখন কেবলমাত্র
মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে আছেন, তেমন সময়ে চন্দ্রনাথের সঙ্গে এসে যুক্ত হন
কৃষ্ণমোহন। উদ্দেশ্য : খৃস্টধর্ম অনুযায়ী কবির শেষ স্বীকারোক্তি আদায় করা।
কবি কোন পাপের কথা স্বীকার করে বিধাতার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, এমন তথ্য
কেউ জানেন না। এহেন পরিস্থিতিতে কৃষ্ণমোহন এবং চন্দ্রনাথ আশঙ্কা প্রকাশ করে
কবিকে জানান যে, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং তাঁকে কোথায় সমাধিস্থ করা
হবে, তা নিয়ে গোলযোগ দেখা দিতে পারে। এমন আস্থাহীন অবস্থায় মাইকেলের
নির্ভীক উত্তর ছিল : ‘‘মানুষের তৈরি চার্চের আমি ধার ধারিনে। আমি আমার
স্রষ্টার কাছে ফিরে যাচ্ছি। তিনিই আমাকে তাঁর সর্বোত্তম বিশ্রামস্থলে
লুকিয়ে রাখবেন। আপনারা যেখানে খুশি আমাকে সমাধিস্থ করতে পারেন-আপনাদের
দরজার সামনে অথবা গাছ তলায়। আমার কঙ্কালগুলোর শান্তি কেউ যেন ভঙ্গ না করে।
আমার কবরের ওপর যেন গজিয়ে ওঠে সবুজ ঘাস।’’
২৯ জুন ১৮৭৩, রোববার, মাইকেলের অন্তিম অবস্থা ঘনিয়ে এলো। তাঁর হিতাকাঙ্ক্ষী
এবং সন্তানরা এলেন তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে। এমন কি, তাঁর যে জ্ঞাতিরা
হিন্দুধর্ম ত্যাগের কারণে তাঁর সঙ্গে সকল সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের
মধ্য থেকে মাত্র একজন এসেছিলেন তাঁকে দেখতে। জীবনের শেষ দুই বছর কবির
নিদারুণ দুর্দশায় সহায়তার হাত প্রসারিত না করলেও, শেষ মুহূর্তে
মৃত্যুপথযাত্রী কবিকে দেখে অনেকেই করুণায় বিগলিত হয়েছিলেন। কিন্তু
বিশ্রামহীন, আঘাতে-উদ্বেগে-পীড়ায় জর্জরিত এবং রোগশীর্ণ দেহ কবি আর ধরে
রাখতে পারলেন না। বেলা দুটার সময়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন চিরদিনের জন্যে।
মাইকেলের ক্ষেত্রে মৃত্যুপরবর্তী ধর্মীয় কাজের সমস্যাজনিত আশঙ্কা প্রবলভাবে
সত্যে পরিণত হলো। তাঁর মৃত্যুর পর সত্যি সত্যিই তাঁর শেষকৃত্য নিয়ে
প্রচন্ড সমস্যা দেখা দিল। যদিও মৃত্যুর শেষ বিদায়ে থাকার কথা ক্ষমা ও
প্রার্থনা, মাইকেলকে সেটা থেকেও বঞ্চিত করা হলো। কলকাতার তৎকালীন খ্রিস্টান
সমাজ তাঁর দীক্ষার ঘটনা নিয়ে ঠিক তিরিশ বছর আগে একদিন মহা হৈ চৈ করলেও,
মৃত্যুর পর তাঁকে মাত্র ছয় ফুট জায়গা ছেড়ে দিতেও রাজি হলো না। ইংলিশম্যানের
মতো পত্রিকাগুলো তাঁর মৃত্যুর খবর পর্যন্ত ছাপলো না। যদিও সে সপ্তাহে
কলকাতায় মোট কয়জন দেশীয় ও খৃস্টান মারা যান এবং আগের সপ্তাহের তুলনায় তা
বেশি, না কম, সে পরিসংখ্যান নিয়েও পত্রিকাটি আলোচনা করে। মিশনারিদের কাগজ
ফেন্ড অব ইন্ডিয়া খুবই সংক্ষেপে তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছাপালো। সংবাদটি তাঁর
কবি-কৃতির ধারে-কাছে দিয়েও গেল না, পত্রিকাটি গুরুত্বের সঙ্গে যা ছাপালো,
তা হলো, তাঁর জীবন-যাপনের অভ্যাসগুলো ছিল অনিয়মে ভরা আর তিনি তাঁর পৈত্রিক
সম্পত্তি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া আরেকটি প্রসঙ্গ এ পত্রিকায় উল্লেখিত
হয়েছিল-‘তিনি তাঁর তিনটি সন্তানের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি।'
নবদীক্ষিত খৃস্টান মাইকেলের প্রতি খৃস্টান সমাজ যে মনোভাব দেখায়, তা
দুঃখজনক এবং তাঁর পূর্বতন স্বজাতি হিন্দু সমাজের কাছ থেকে পাওয়া আঘাতের
সঙ্গে তুলনীয়। তবে মৃত্যুকালীন আচরণ অভাবনীয় কঠোরতা আর ক্ষুদ্রতার পরিচয়
বহন করে। কেননা, মৃত্যুর পরে মৃতের প্রতি এ রকমের রোষের ঘটনা ক্বচিৎ দেখা
যায়। যাঁর সঙ্গে মাইকেলের কবিতার মিল না থাকলেও, ব্যক্তিগত জীবনে অনেক মিল
লক্ষ্য করা যায়, সেই শার্ল বোদলেয়ারের মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রতি অনেকের
আক্রোশ প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর স্বীকারোক্তি-বক্তব্য নিয়ে, তাঁর কবি-কৃতি
নিয়ে অনেকে বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন। ফরাসি সাহিত্যসাধকদের বেশির ভাগই তাঁর
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আসেন নি। কিন্তু ফরাসি সমাজ তাঁর মৃতদেহ সৎকারের ঘটনা
নিয়ে এমন অমানবিক আচরণ করেনি, যেমনটি করা হয়েছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের
ক্ষেত্রে।
জুনের শেষ পাদে দারুণ গ্রীষ্মের সময়ে মাইকেলের মৃত্যু হলেও, খৃস্টান সমাজের
সৃষ্টি-ছাড়া রোষের দরুন সেদিন এবং সেদিন রাতে তাঁর মরদেহ পড়ে থাকলো
দুর্গন্ধ-ভরা নোংরা মর্গে। কৃষ্ণমোহন ছিলেন কলকাতার খৃস্ট ধর্মযাজকদের
মধ্যে একজন প্রবীণ সদস্য, যদিও তিনি এ সময়ের অনেক আগে থেকেই সরাসরি
ধর্মযাজকের কাজ ছেড়ে দিয়ে বিশপস কলেজে অধ্যাপনা করছিলেন এবং মাইকেল মারা
যাওয়ার আগের সময়কালে অধ্যাপনা থেকেও অবসর নিয়েছিলেন, তিনি উদ্বিগ্ন চিত্তে
নিজে ছুটে গিয়ে তদবির করলেন লর্ড বিশপ রবার্ট মিলম্যানের কাছে। মিলম্যান এর
ছয় বছর আগে বিশপ হয়ে কলকাতায় আসেন। দেশীয়দের এবং স্থানীয় ধর্মান্তরিত
খৃস্টানদের সঙ্গে তার বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বাংলাসহ বেশ কয়েকটি
দেশীয় ভাষাও শিখে নিয়েছিলেন। এমন কি, তিনি নিজে দুই খন্ডে মাইকেলের প্রিয়
কবি ত্যাসোর জীবনীও লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর ধর্মযাজকদের ‘বিতর্কিত'
বিষয়ে যোগ দানে বাধা দিলেন। এহেন লর্ড বিশপ রবার্ট মিলম্যান মাইকেলের
মৃত্যুর পরের দিন সকালেও কবির মৃতদেহ খৃস্টানদের গোরস্থানে সমাহিত করার
অনুমতি দিলেন না! অন্যদিকে মাইকেলের স্বদেশবাসী ও ধর্মগোষ্ঠীর হিন্দু সমাজও
তাঁকে গঙ্গার ঘাটে পোড়াতে আগ্রহী হলো না। সুতরাং আষাঢ় মাসের ভেপসা গরমের
মধ্যে মাইকেলের অসহায় মরদেহ মর্গেই পচতে থাকে। স্বধর্ম ও স্বজাতির কাছে
‘সিদ্ধান্তহীন ও আগ্রহরহিত' মাইকেলের নিঃসঙ্গ ও অভিভাবকহীন মরদেহ তৎকালীন
কলিকাতার বাঙালি হিন্দু ও খৃস্ট সমাজের কাছে কলঙ্কচিহ্নস্বরূপ অপাঙতেয় ছিল,
যদিও সেই ঐতিহাসিক মৃতদেহটি বস্তুতপক্ষে বাঙালি হিন্দু ও খৃস্ট সমাজের
মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও কুসংস্কারের প্রতি তীব্র কটাক্ষই
করছিল।
অবশেষে মাইকেল-মৃতদেহ-সমস্যার সমাধান হলো, যখন সাহস নিয়ে এগিয়ে আসেন একজন
ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজক। তিনি কবির মরদেহ সমাধিস্থ করার সংকল্প প্রকাশ করেন।
প্রায় একই সময়ে অ্যাংলিকান চার্চের একজন সিনিয়র চ্যাপেলেইন-রেভারেন্ড পিটার
জন জার্বো, বিশপের অনুমতি ছাড়াই তাঁর মৃতদেহ সমাধিস্থ করার উদ্যোগ নেন।
৩০ জুন বিকেলে, মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পরে, কবির মৃতদেহ নিয়ে তাঁর ভক্ত এবং
বন্ধু-বান্ধবসহ প্রায় হাজার খানেক মানুষ এগিয়ে যান লোয়ার সার্কুলার রোডের
খৃস্টান গোরস্থানের দিকে। সেকালের বিবেচনায় এই লোক সংখ্যা খুব কম নয়।
শবানুগমনে কলকাতার বাইরের বহু লোক অংশ নেন; অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল নানা
ধর্মের ও বর্ণের মানুষ। তবে একদিন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ
নিজের গ্রন্থ উৎসর্গ করে কবি যাঁদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিখ্যাত
করেছিলেন, তাঁদের কেউ এই ভিড়ের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন না। মাইকেল যেখানে
চলেছেন, সেই লোয়ার সার্কুলার রোডের গোরস্থানে মাত্র চার দিন আগে কবিপত্নী
হেনরিয়েটাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। কবির জন্যে কবর খোঁড়া হয় স্ত্রীর কবরের
পাশে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যখন নিশ্চিতভাবে হতে চলেছে, তেমন সময়ে লর্ড বিশপের
অনুমতি এসে পেছন-পেছন হাজির হলো। তবে ব্যক্তিগতভাবে কোনো নামকরা পাদ্রী বা
ধর্মীয় নেতা তাঁর শেষকৃত্যে এসেছিলেন বলে জানা যায় নি। এমন কি, কৃষ্ণমোহনও
নন। অনেক পাদ্রী বরং তাঁদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকেন। রেভারেন্ড
পিটার জন জার্বোই কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধা করেন। চার্চের ব্যুরিয়াল
রেজিস্টারে তাঁর নাম পর্যন্ত উঠানো হলো না। লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস
লাইব্রেরিতে রক্ষিত চার্চের রেজিস্টারে কবিকে এবং তাঁর স্ত্রী হেনরিয়েটাকে
সমাধিস্থ করার কোনও তথ্য নেই।
কলকাতার যে ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ বাস করতো, তাদের মধ্যে
নীতি-নৈতিকতা ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার দৃষ্টান্ত থেকে
আরম্ভ করে পরপীড়ন, ব্যভিচার, ধর্মহীনতার দৃষ্টান্ত কিছু কম ছিল না। বাংলা
গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ হেনরি পিটার ফরস্টার অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে এক দশকের
বেশি ঘর করেছিলেন। তাঁর সন্তানরা সবাই এই পরস্ত্রীর গর্ভে জন্মেছিল।
আনুষ্ঠানিক ধর্ম ও শিষ্টাচারে তাঁর সামান্যতম আস্থা ছিল, এমন কোনও প্রমাণ
নেই। তা সত্ত্বেও, মাইকেলের প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আরও অনাধুনিক ও গোড়া সমাজ
পরিস্থিতিতে ১৮১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি যখন মারা যান, তখন তাঁকে
সমাধিস্থ করার প্রশ্ন নিয়ে কোনো মতান্তর দেখা যায় নি। খুনী, ধর্ষণকারী,
অজাচারী, অধর্মাচারী, অবিশ্বাসী-কাউকে সমাধিস্থ করার জন্য কখনোই লর্ড
বিশপের কাছে ধর্ণা দিতে হয় নি। মৃত্যুর মতোই পেশাজীবনেও মাইকেল আক্রান্ত
হয়েছিলেন। ব্যারিস্টারি পাস করার পর, তিনি যখন আইন-ব্যবসা শুরু করার জন্য
হাইকোর্টে আবেদন করেন, তখন তাঁকে গ্রহণ না করার জন্য বিচারকদের মধ্যে প্রবল
মনোভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজে নিশ্চয় আরও
শত শত লোক ছিলেন, যারা এই বিচারকদের মতো তাঁর প্রতি সমান অথবা আরও বেশি
বিদ্বেষ পোষণ করতেন। মাইকেল মদ্যপান করে মাঝে মাঝে বেসামাল হয়ে পড়তেন, তিনি
কখনও কখনও রূঢ় আচরণ করেন, বিচারকরা মাইকেলের বিরুদ্ধে তাঁদের গোপন
রিপোর্টে এ কথা লিখেছিলেন। কলকাতার হাজার হাজার ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান
সম্পর্কেও কি এই মন্তব্য করা যেতো না ? তা হলে মাইকেল সম্পর্কে
শ্বেতাঙ্গদের এ রকমের বিরূপতার মূল কারণটা কি ? বর্ণবাদ ? মৌলবাদ ?
ধর্মান্ধতা? সাম্প্রদায়িকতা?
মাইকেল-জীবনীকার ও বিশেষজ্ঞ গোলাম মুরশিদের গবেষণায় শ্বেতাঙ্গদের
মাইকেল-বিদ্বেষের কিছু কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গোলাম মুরশিদের ধারণা,
মাইকেলের বিরুদ্ধে অন্য যেসব অভিযোগই থাক না কেন, তিনি যে শ্বেতাঙ্গিনী
বিয়ে করেছিলেন অথবা শ্বেতাঙ্গিনীকে নিয়ে ঘর করেছিলেন-এটাকে শ্বেতাঙ্গরা
বিবেচনা করতেন তাঁর অমার্জনীয় অপরাধ হিসাবে। তৎকালে শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে কেউ
কেউ দেশীয় মহিলাদের বিয়ে করেছিলেন অথবা উপপত্নী রেখেছিলেন। এটা সহ্য করা
হলেও, একজন শ্বেতাঙ্গিনীর পাণিপীড়ন করবে এক কালা আদমী-এটা তাঁরা একেবারে
সহ্য করতে পারতেন না। মিশনারিরা, তাঁদের মতে, দেশীয়/স্থানীয়/কৃষ্ণকায়দের
অন্তহীন আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে
ঈশ্বর-কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ধরে নেয়া যেতে পারে, তাঁরা
অন্তত বর্ণবিদ্বেষী হবেন না। কিন্তু বিশপস কলেজে থাকার সময়েও মাইকেল যথেষ্ট
বর্ণবিদ্বেষ লক্ষ্য করেছিলেন। বিশপস কলেজের কাগজপত্রে তাঁর নাম একটি বারও
মাইকেল বলে লিখিত হয় নি। সর্বত্র তিনি শুধু মধুসূদন ডাট। একজন কৃষ্ণাঙ্গের
একটি ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ নাম তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। লন্ডনে
থাকার সময়ে মাইকেল সেখানে যে তীব্র বর্ণবিদ্বেষ লক্ষ্য করেছিলেন, তার
অন্যতম কারণ ছিল হেনরিয়েটা। তিনি একজন শ্বেতাঙ্গকে বিবাহ করে, তারপর তাঁকে
পরিত্যাগ করে অন্য একজন শ্বেতাঙ্গিনীকে নিয়ে ঘর করছিলেন, এটাকে লন্ডন বা
কলিকাতার শ্বেতাঙ্গ বা আধা-শ্বেতাঙ্গ (অ্যাংলো) সমাজ আদৌ মেনে নিতে পারে
নি; অনুমোদনের তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তাই বলে মরদেহের প্রতিও বিদ্বেষ ?
মৃতদেহের প্রতি কি কারও বিদ্বেষ থাকে ? না থাকাই উচিত এবং স্বাভাবিক।
কিন্তু কবির মরদেহের প্রতি তাঁরা যে অসাধারণ বিদ্বেষ দেখিয়েছেন, তা থেকে
বোঝা যায়, জীবিত মাইকেলকে তাঁরা আন্তরিকভাবে কতোটা ঘৃণা করতেন।
মাইকেল তাঁর সমকালের দেশীয় সমাজে যাদের চারপাশে বসবাস করতেন, তাঁদের তুলনায়
তিনি ছিলেন অনেক ক্ষমতাসম্পন্ন ও প্রতিভাবান। জনারণ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে
তাঁকে চোখে পড়ার মতো গুণাবলী তিনি প্রচুর পরিমাণে আয়ত্ত করেছিলেন কর্ম,
কীর্তি ও জীবন-যাপনের মাধ্যমে। বাংলা সাহিত্যকে তিনি একা যতোটা এগিয়ে
দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ছাড়া অন্য কেউ তা করতে পারেন
নি। বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব হিসাবে তিনি জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তীতে পরিণত
হয়েছিলেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তিনি সত্যিকারভাবে সেই সমাজের আপন হতে পারেন
নি। জীবনের শেষ দুই-তিন বছরে তিনি ঈর্ষার অযোগ্য যে করুণ পরিণতি লাভ
করেছিলেন এবং তাঁকে সমাধিস্থ করার ঘটনা নিয়ে যে কুৎসিত নোংরামি দেখা
দিয়েছিল, তা থেকে মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির অভ্রান্ত
প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি যখন নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে মৃত্যুর দিন গুণেছেন, তখন
তাঁর পিতৃপ্রদত্ত হিন্দু ধর্মীয় সমাজের বা পরে স্বদীক্ষিত খৃস্ট ধর্ম
সমাজের খুব কম লোকই তাঁর খবর নিয়েছেন, সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। বরং তাঁর
মৃতদেহ নিয়ে করেছে নোংরামি, যার অন্য নাম---মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা,
সাম্প্রদায়িকতা।
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও আসল মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা,
সাম্প্রদায়িকতা রেখে যারা অন্যায়ভাবে ইসলামের পিছনে ধাওয়া করেছে, তাদেরকে
ইতিহাস একদিন মিথ্যাচারের জন্য চপেটাঘাত করবে। বিদেশি প্রভুরা দূর দূর করে
তাড়িয়ে দিলে তাদেরকেও অবশেষে শেষ আশ্রয়স্বরূপ মানবতা ও
সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের শান্তির ধারাতেই একদিন ফিরে আসতে
হবে। কেননা ইসলাম সকল প্রকৃত অনুতাপকারীর জন্যেই ক্ষমা ও ভালোবাসার দ্বার
চিরকালের জন্য খোলা রেখেছে।

mahdi briged
আমি নতুন
আমি নতুন

পোষ্ট : 12
রেপুটেশন : 0
নিবন্ধন তারিখ : 15/04/2011

Back to top Go down

Back to top


 
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum