Melbondhon
এখানে আপনার নাম এবং ইমেলএড্রেস দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন অথবা নাম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন
widgeo

http://melbondhon.yours.tv
CLOCK
Time in Kolkata:

সান্তালদের(সাঁওতাল) মিথলজি -১

Go down

সান্তালদের(সাঁওতাল) মিথলজি -১ Empty সান্তালদের(সাঁওতাল) মিথলজি -১

Post by fote alom on 2011-07-16, 02:31

সংস্কৃতি, ইতিহাস ,ঐতিহ্য এবং উপকথা। এদের সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে মিথলজি প্রকাশ করা হবে ।

পূর্ব পুরুষদের কথা

বলিয়ান গুরু যেভাবে বলেছেনঃ

সূর্য উদয়ের দিকে মানবের জন্ম। পৃথিবী জলময়, আর জলের নীচে মৃত্তিকা। ঠাকুরজিউ, জলজ প্রানী সকল, কাকড়া, কুমীর, হাঙ্গর, রাঘব বোয়াল, গলাদা চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতি মাছ সৃজন করলেন।

জলজ প্রনী সৃষ্টি সম্পন্ন পর ঠাকুর জিউ, ভাবলেন এখন কি সৃষ্টি করব? সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, মানুষ সৃষ্টি করব। তখন তিনি মাটি দিয়ে মানুষ তৈরী শুরু করলেন, মানুষের রূপ গড়া সম্পূর্ণ হল। মানুষরূপী প্রতিমা দুটিকে রৌদ্রে শুকাতে দিয়েছেন। শুকানো হলেই দুটিতে পান বায়ু সঞ্চার করবেন। ইতোমধ্যে উপর থেকে সূর্য দেতার ঘোড়া “সিঞ সাদম” মর্তে জলপান করার জন্য অবতনের সময় মনুষ্য মূর্তি দুটি তার পায়ের আঘাতে গুড়িয়ে যায়। এতে ঠাকুর জিউ অত্যন্ত ব্যথিত হলেন।


ঠাকুর জিউ সংকল্প করলেন মাটির মানুষ আর গড়ব না। পাখী সৃষ্টি করব। তারপরে তিনি তার নিজ অঙ্গের অর্থাৎ কণ্টের নীচে যে হাড় আছে তার উপরের অংশ দিয়ে হাঁস, হাসিল নামক দুটি পাখী গড়লেন। যে অংশ থেকে হাঁস গড়লেন সাওতালরা ঐ অঙ্গকে হাঁস জাং হলে। তাই অঙ্গের নামানুসারে পাখি দুটির নাম হলো হাঁস ও হাঁসিল। হাঁস-হাসিল গড়ার পর ঠাকুর জিউ তাদের হাতের তালুতে রেখে দেখছেন নিজের সৃষ্টিতে নিজে বিমোহিত। পাখি দুটিকে অত্যন্ত সুন্দর লাগছে। পাখি দুটিকে ফু দিয়ে প্রান বায়ু সঞ্চার করলেন। প্রান পেয়ে তারা জীবন্ত হয়ে গেল এবং আকাশে উড়ে গেল। তারা কেবল উড়তেই থাকল বসার কোথাও কোন স্থল নেই, বসার জায়গা নেই, তাই তারা ঠাকুর জিউ হাতের উপর এসে বসত।

সূর্য দেবের ঘোড়া সিঞ সাদম তড়ে সূতাম দিয়ে মর্তে জলপান করতে নেমে এলন। জলপান করার সময় তার মুখ থেকে কিছু ফেনা জলের উপর ছড়িয়ে গেল। এ ফেনা জলের উপর ভেসে থাকল। জলের উপরে এ ফেনা জমাট বেধে ফেড় সৃষ্টি হল।

তখন ঠাকুর জিউ পাখি দুটিকে বললেন যাও তোমরা ওই ফেনার উপরে গিয়ে বস। পাখি দুটি তখন তার উপরে বসল। বসলে পর ঐ জমাটবদ্ধ ফেনা তাদেরকে নৌকার মত ভাসিয়ে নিয়ে বেড়ায়। একদিন তারা ঠাকুরজিউকে নিবেদন করল ঠাকুরজিউ পরিভ্রমন করছি মনের আনন্দে, কিন্তু আহার পাচ্ছি না।

তখন ঠাকুর জিউ কুমীরকে ডেকে পাঠালেন, কুমীর এলো। কুমীর ঠাকুরজিউকে বিণীত ভাবে বললেন ঠাকুর, কেন আমাকে স্মরণ করেছেন? ঠাকুর বললেন মাটি উত্তোলন করতে পারবে? কুমীর জলের নীচ থেকে কামড়ে মুখে করে মাটি আনতেছিল কিন্তু সব গলে গেল। কুমীর মাটি আনতে ব্যর্থ হল।

তারপরে ঠাকুর জিউ গলদা চিংড়িকে ডাকলেন। সে আসল, এসে ঠাকুরজিউকে বললেন, ঠাকুর আমাকে কেন তলব করেছেন? ঠাকুর বললেন মাটি তুলতে পারবে? গলদা চিংড়ি জবাবে বলল আপনি যদি বলেন তবে নিশ্চয় তুলতে পারব। তখন চিংড়ি গভীর জলে ডুব দিল, ডাটম করে মাটি তুলে আনতেছিল কিন্তু সব গলে গেল।

তখন ঠাকুর রাঘব বোয়ালকে ডাকলেন, সে এল। এসে ঠাকুরজিকে নিবেদন করল ঠাকুর কি প্রয়োজনে আমাকে স্মরণ করেছেন? ঠাকুর তাকে বলল, মাটি তুলতে পারবে? রাঘব বোয়াল উত্তর দিল আপনি যদি বলেন তাহলে আমি মাটি তুলতে পারব। তখন রাঘব বোয়াল গভীর জলের নীচে মাটিতে কামড় দিয়ে কিছু মাটি মুখে ও কিছু পিঠে নিয়ে রওয়ানা হলো কিন্তু সব গলে গেল। তখন থেকে বোয়াল মাছের আশ খুলে গেল বা আশ আর নেই।

তখন ঠাকুরজি ধিরি কাটকমকে (কাকড়া) ডাকলেন। ধিরি কাটকম হাজির হল। এসে ঠাকুরজিকে বললেন আমাকে কেন ডেকেছেন ঠাকুরজি? ঠাকুরজি তাকে বলল মাটি তুলতে পারবে? ধিরি কাটকম উত্তর দিল আপনি বললে নিশ্চয় তুলতে পারবো। তখন ধিরি কাটকম গভীর জলে ডুব দিল এবং ডাটক করে মাটি আনতেছিল কিন্তু সব গলে গেল, তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল।

তারপরে ঠাকুরজিউ কেঁচোকে ডাকলেন কেঁচো আসল। এসে ঠাকুরজিকে বিনীত ভাবে বললেন ঠাকুরজি কি প্রয়োজনে আমাকে স্মরণ করেছেন। ঠাকুরজি তাকে বলল, জলের গভীর তলদেশ থেকে মাটি তুলতে পারবে? কেঁচো ঠাকুরজিকে প্রতি উত্তর করল আপনি অনুমিত দিলে তুলতে পারি যদি জলের উপরে কূর্ম (কচ্ছপ) স্থির হয়ে থাকে। তখন ঠাকুরজি কচ্ছপকে ডাকলেন সে আসল, এসে ঠাকুরজিকে বললেন ঠাকুর কেন আমাকে ডেকেছেন। ঠাকুরজি বললেন কেউ মাটি তুলতে পারছেনা কেঁচো মাটি তোলার দায়িত্ব নিয়েছে যদি তুমি জলের উপরে স্থির হয়ে দাড়াও। কচ্ছপ ঠাকুরজির প্রতি উত্তর দিল, আপনি যদি আদেশ করেন, তাহলে আমি দাড়াব। তখন কচ্ছপ জলের উপরে স্থির হলেন স্থির হলে পর, ঠাকুরজি তার চার পায়ে শিকল বেঁধে টেনে দিলেন। এমনি অবস্থায় কচ্ছপ জলের উপরে স্থির হলেন। তখন কেঁচো মাটি তোলার জন্য গভীর জলে ডুব দিলেন, মাটির স্পর্শ পেলেন, তার লেজ এর প্রান্ত কচ্ছপের পিঠে অন্যদিকে মুখ দিয়ে সে মাটি খেতে শুরু করল এবং কচ্ছপের পিঠে মাটি রাখতে লাগল। সে মাটি সর এর মত (Cream এর মত) জমতে শুরু করল। কচ্ছপ এক নাগাড়ে মাটি তুলছেই, কচ্ছপের পিঠ মাটিতে পূর্ণ হলো। তখন কেঁচো মাটি তোলা বন্ধ করল এবং বিশ্রাম নিল।

তারপরে ঠাকুরজিউ উত্তোলিত মাটিতে মই টেনে দিলেন, মই টানতে টানতে কিছু মাটি শক্ত হলো। শেষে মইয়ে লেগে থাকা মাটি তিনি ঝেড়ে ফেললেন এ ঝেড়ে মাটি গুলোতে পাহাড়, পর্বত সৃষ্টি হলো। মাটি তোলা শেষ পলে পর, মাটির উপরে সে “ফেড় দা” Cream এর মত জল নির্গত হচ্ছিল তা শুকিয়ে গেল তখন ঠাকুরজি ঐ ‘ফেড়” লাগানো মাটিতে (সিরাম বীজ) বিন্নার বীজ ছড়িয়ে দিলেন; তা অঙ্কুরিত হলে পর তিনি দুর্বা ঘাসের বীব ছড়িয়ে তা জন্মালেন, তারপরে কারাম বৃক্ষ তারপরে তপে সারজম (এক ধরণের শালগাছ) লাকড় আতনা, লাডেয়া মাতকত। তারপরে তাবৎ লতাগল্ম বৃক্ষরাজী সৃষ্টি করলেন। ধরিনী শক্ত হল। যেখানে যেখানে জল ছিল সেখানে মাটির চাপা দিলেন আর যেখানে যেখানে জলের ধারা (ভুমবুক) নির্গত হচ্ছে সেখানে সেখানে বড় বড় পাথর চাপা দিলেন।
তারপরে চতুষ্পদ প্রানী সকল ও দ্বিপদ পক্ষী সকল সৃষ্টি করলেন। মাটির পোকা সকল (হাসা গান্ডার) সৃষ্টি করলেন।

মানব সৃজনঃ

অপরূপ ধার্তি (পৃথিবী) সৃষ্টি হল। দিন যায়; এক সময় হাঁস-হাসিল সিরাম দান্ধিতে (বিন্না ঝোপে) বাসা বাধল, হাসিল দুটি ডিম প্রসব করল। হাসিল ডিমে তা দেয়, আর পুরুষ হাসটি খাদ্য সংগ্রহ করে আনে এভাবে করতে করতে একদিন ডিম ফুটল। আশ্চর্য! ডিম থেকে দুটি মানব শিশুর জন্ম হয়েছে। একটি পুরুষ শিশু ও অন্যটি মেয়ে শিশ।

এমনি সন্ধিক্ষণে হাস-হাসিল মহা চিন্তিত। কর্তব্য বিমুঢ় তখন তারা হমর সুরে (বিলাপ করে)

হায় হায় জালা পুরিরে

হায় হায় নুকিন মানেআ

হায় হায় বুসৗড় আকান কিন,

হায় হায় নুকিন মানেআ

হায় হায় তকারে দহকিন।

হায় হায় এহো ঠাকুরজিউ

হায় হায় মারাং ঠাকুরজিউ।

হায় হায় বুসৗঢ় আকানকিন

হায় হায় একিন মানেআ

হায় হায় তকারে দহকিন।

বঙ্গানুবাদ-

হায় হায় এ দুটি মানব

হায় হায় জন্ম নিয়েছে

হায় হায় এ দুটি মানব

হায় হায় কোথায় রাখিব।

হায় হায় ওহে ঠাকুরজী

হায় হায় পরম ঠাকুরজী

হায় হায় জনম নিয়েছে

হায় হায় এ দুটি মানব

হায় হায় কোথায় রাখিব।

হাঁস-হাসিলের করুন আর্তি, আকুল আবেদনে ঠাকুরজি সাড়া দিলেন। তাদের সামনে প্রকট হলেন তারা ঠাকুরজিকে নিবেদন করল কেমন করে এ মানব দুটিকে বাচাব? ঠাকুরজিউ তাদেরকে তুলো দিলেন এবং বললেন তোমরা যা যা খাও তার রস বের করে এ তুলো ভিজিয়ে নিও এবং এদেরকে চুষে খাওয়াবে। তারা ঠাকুর জিউ এর শিক্ষা মতে অনুরুপ ভাবে খাওয়াতে লাগল। শিশু দুটি চুষে খেয়ে হাটতে শিখল। শিশু দুটি বড় হতে হতে হাস-হাসিল চিন্তিত হল। বড় হলে এদেরকে কোথায় রাখা হবে।

তখন তারা আবার ঠাকুরজিউকে স্মরণ করলেন; তখন ঠাকুরজিউ তাদেরকে উপদেশ দিলেন তোমরা উড়ে গিয়ে এদের থাকার জন্য জায়গা পচ্ছন্দ করে আস। তখন তারা সূর্য অস্তের দিকে উড়ে গেল। প্রকৃতির নৈসর্গ লীলা ভূমি (হিহিড়ি-পিপিড়ি) এলাকাটি পছন্দ করল। ফিরে এসে তারা ঠাকুরজিউকে তাদের পছন্দমত জায়গার বিবরণ জানাল। তখন তিনি তাদেরকে বললেন অতি উত্তম। এখন তোমরা এদেরকে সেখানে নিয়ে যাও। তখন হাঁস-হাসিল শিশু দুটিকে পিঠে করে উড়ে নিয়ে যেখানে পৌঁছে দিল।

যেহেতু তাদের জন্মস্থান থেকে সূর্য অস্তের দিকে তাদেরকে পৌঁছে দেয়া হল, এই জন্যই এ পুরা কাহিনী মতে বলা হয়ে থাকে মানবের জন্ম সূর্য উদয়ের দিকে। হিহিড়ি-পিপিড়ি মানব শিশু দুটিকে পৌঁছে দেয়ারপর হাঁস-হাসিল দুটি কোথায় অন্তর্ধন হলেন সে বিষয়ে কোন বর্ণনা নেই। হয়তোবা মানব জন্মের লীলার জন্যই তাদের আগমন ঘটেছিল।
fote alom
fote alom
তারকা সদস্য
তারকা সদস্য

লিঙ্গ : Male
পোষ্ট : 129
রেপুটেশন : 0
শুভ জন্মদিন : 10/03/1956
নিবন্ধন তারিখ : 27/05/2011
বয়স : 63
অবস্থান : রাশিয়া
পেশা : বিজনেস
মনোভাব : কাইউতা

Back to top Go down

সান্তালদের(সাঁওতাল) মিথলজি -১ Empty Re: সান্তালদের(সাঁওতাল) মিথলজি -১

Post by fote alom on 2011-07-16, 02:40

বংশ বৃদ্ধির বিবরণ :
উল্লেখিত মানব মানবী দৃটির নাম হয় হাড়াম আর আয়ো। কোন কোন বিন্তি গুরু বলেন পিলচু হাড়াম ও পিলচু বাডহী। বাস্তবিক ভাবে লক্ষ্য করা যায় পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুডহী নামটিই সমাজে বেশী প্রচলিত। সেই সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিহিড়ি-পিপিড়িতে সুমতু বুকুচ ঘাস এর শস্যকনা এবং শামা ঘাস এর শীষের কনা খেয়ে খেয়ে তারা বয়োবৃদ্ধি হতে লাগল। পরিনামে তারা যৌবনপ্রাপ্ত হলেন। কিন্তু পরনে পরিচ্ছদ নেই, উলঙ্গ, তা সত্বেও তাদের লজ্জ্বাবোধ নেই, তারা আনন্দপূর্ণ জীবন যাপন করত।

ঠাকুরজিউ’র সংবাদ বাহক ও সকল কর্মের মন্ত্রনার সহযোগি সেই লিটা একদিন তাদের কাছে এসে বললেন, ওহে নাতী, তোমরা কোথায় কেমন আছে? আমি তোমাদের দাদু। তোমাদের খোঁজ খবর নিতে এলাম। তা দেখে তো মনে হয়, তোমরা বেশ আনন্দেই আছ। কিন্তু এছাড়াও তোমরা এক মধুর আনন্দ এখনো অনুভব করনি। তোমরা হান্ডি প্রস্তুত কর, এটা অত্যান্ত চিত্তকর্ষক। তখন পিলচু হাড়াম, পিলচু বুডহী বলল, ওহে লিটা গড় বা (দাদু) আমরা তো তার প্রস্তুত প্রণালী জানিনা কিভাবে তা প্রস্তুত করবো। লিটা বললেন ঠিক আছে, আমি তোমাদের তা শিখিয়ে দিব। তখন তারা তিনজনে বনে গমন করলেন। লিটা তাদেরকে হান্ডি তৈরীর ঔষদের গাছ চিনিয়ে দিলেন এবং তার শিকড় তারা খুড়ে আনলো।

শিকড়-বাকল আনলে পর, লিটা পিলচু বাডহীকে বললেন, তুমি চাউল ভিজিয়ে দাও। সে চাউল ভিজিয়ে দিল। চাউল মানে সুমত বুকুচ আর শামা ঘাসের বীজ। সেই ভিজানো চাল দিয়ে তারা আটা প্রস্তুত করল। জঙ্গল থেকে নিয়ে আসা শিকড় বাকল থেতলিয়ে তার রস দিয়ে আটার মন্ডের সঙ্গে মিশান হলো। তাপরে ঐ মন্ড দিয়ে বটিকা বা বড়ি প্রস্তুত করা হলো। ঐ বড়িগুলো একটি ঝুড়িতে খড়সহকারে রাখা হয়। পরের দিন, গতকাল যে সময় ওই বড়িগুলো ঘরে তুলে রাখা হয়েছিল ঐ সময় সেগুলোকে আবার খোলা হল। খড়সমূহফেলে দেয়া হলো তারপরে বড়িগুলো কুলোতে করে রৌদ্রে শুকাতে দেয়া হল। বড়িগুলো ভাল করে শুকালে পর তুলে রাখা হয়। এর না রাখা হলো রানু[1] । তারপরে সুমতু গুতুচ আর শামা খাসের শীষ এনে তা মাড়াই করা হল। তার শস্যকনা ছাড়াই করে চাল করা হল। চাল রান্না হল। রান্না ভাত ঠানা হলে পর তার সঙ্গে তৈরী করা রানু মিশানো হল। এ রানু হাড়িতে ভাতের মধ্যে রাখা হল এবং পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হল। পাঁচ দিনের মাথায় হাড়ির উক্ত ভাত উত্তম রূপে পচে গেল, বিকালে তারা তাতে পানি ঢেলে দিল। তখন লিটা তাদেরকে বললেন, উত্তম এখন তোমরা প্রথমে মারায় বুরুর[2] নামে উৎসর্গ (চডর) করে এই হান্ডি পান কর। আমি আবার আগামী কাল আসব।

তখন তারা গাছে তিনটি বাটি তৈরী করল। বাটি তিনটি প্রস্তুত করা পচানি দিয়ে ভর্তি করা হল। পিলচু হাড়াম তিনিটির মধ্যে একটি বাটির হান্ডি মারায় বুরুর নামে মাটিতে ফোটা ফোটা করে চডর বা উৎসর্গ করলেন। তারপরে তারা নিজেরা পান করলেন। একটু নেশা হল, তারা হাসি মশকরা করতে লাগল। তারা আনন্দ করতে করতে হান্ডি খেয়ে শেষ করল। তাদের গভীর নেশা হয়। রাত্রে একই বিছানায় দুজনে শয়ন করলেন। সকালে লিটা আসলেন। এসে ডাক দিলেন, ওহে নাতি তোমরা উঠেছ কিনা? তোমরা বেরিয়ে আস। লিটার ডাকে চেতন হলে বুঝতে পারল যে তারা উলঙ্গ এবং সেই সঙ্গে লজ্জাবোধ করল। এজন্য তারা লিটাকে বললেন ওহ দাদু কেমন করে বের হব, আরা খুবেই লজ্জাবোধ করছি। আমরা উলঙ্গ। গতরাত্রে হান্ডি খেয়ে কি যেন অন্যায় করে ফেলেছি। তখন লিটা বললেন সেটা তেমন কিছু নয়। এ বলে তিনি মুচকি মুচকি হেসে চলে গেলেন।

তখন পিলচু হাড়াম আর পিলচু বুডহী লজ্জা নিবারনের জন্য বটের পাতা দিয়ে লজ্জা নিবারন করলেন। সময়মত তাদের সন্তানাদি হল। সাত পুত্র ও সাত কন্যা। জেষ্ঠ পুত্রে নাম সান্দ্রা, দ্বিতীয়ের নাম চারে কনিষ্ঠতম পুত্রের নাম মানে, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠের নাম আমরা ভুলে গেছি। মেয়েদের নাম যথাক্রমে ছিতা, কাপুরা, হিসি, ডুমনী, দাড়গে, পুড়গে ও

দিন কেটে যায়, সন্তানেরা বয়োপ্রাপ্ত হল। হাড়াম ছেলেদের নিয়ে একদিকে শিকার করতে যায় আর বুডহী মেয়েদের নিয়ে অন্য দিকে শাকপাতা ও অন্যান্য আনাজ সংগ্রহে যান। সন্ধ্যা হলে তারা ঘরে একত্রিত হয়।

একদিন যুবকেরা “খান্দেরায়” বনে পিতাকে ছাড়াই তারা শিকারে গেল। অন্য দিকে মেয়েরাও মাতাকে ছাড়াই তারা সুড়ুকুচ বনে শাক পাতা আনতে গেল। শাকপাতা সংগ্রহের পর মেয়েরা “চাপাকিয়া” বট গাছের নীচে এসে জমায়েত হল। তখন তারা বটের লতায় দোল খেলছে। কিছুক্ষণ দোল-ঝুলা খেলার পর তারা “ডাহার নাচ” শুরু করল। তখন তারা গাইলঃ

মুচকো মুচকো দকো দুংগুত দুংগুদো নায়ো

চাপাকিয়া বাড়ে লাতার ডাররেকো দুংগুত দুংগুদো।

অনুবাদঃ

পিপিলিকা পিপিলিকা জটলা বেধেছে মাগো, জটলা বেধেছে

ঝাপড়া বটের ডালের নীচে জটলা বেধেছে।

যুবকেরা এক “বইবিন্দি” হরিণ (মাঝারী আকৃতির) শিকার শেষে ক্লান্ত হয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছিল। যুবতীদের গান শুনে তারা বলাবলি করতে লাগল। আরে ভাই ঐ যে কারা যেন গান গায়? তখন তারা শিকার করা হরিণটাকে ফেলে এগিয়ে গেল এবং যুবতীদের সঙ্গে নাচ গানে করতে লাগল। নাচ-গান করতে করতে তাদের দেহে মনে মাদকতা আসে। জৈষ্ঠ্যের সঙ্গে জৈষ্ঠা কনিষ্ঠের সঙ্গে কনিষ্ঠা এভাবে তারা সকলে পরস্পরকে পছন্দ করল। তখন জৈষ্ঠ ও জৈষ্ঠা যুবক-যুবতী শিকার করা ফেলে আসা হরিনের খোঁজে গেল। তখন অবশিষ্ট যুবক-যুবতীরা গাইলঃ

বাড়ে লাতার লাতারতে জেল হপন

নায়ো ঞেল গদে “বইবিন্দি” জেল হপন

অনুবাদঃ

বট গাছে নীচে হরিন শাবক

মাগো, ত্বরা করে দেখে আয় হরিণ শাবক।

তখন তারা নিজে নিজে জুটি বাধল। তাদের এ কর্মকান্ড দেখে হাড়াম-বুডহী পারস্পারিক আলোচনা করল, যে এদের পারস্পারিক মনমিলন ঘটেছে। এদেরকে আমরা বিয়ে দিব। তখন তারা একটি ঘন নির্মান করল। সেই ঘরটিতে সাতটি কামরা করা হল। ঘরের কাজ সম্পূর্ণ হলে পর হাড়াম-বুডহী হান্ডি রাখল। তাপরে সেই হান্ডি সকলে মিলে পান করল। হান্ডি পান করার হাড়াম বুডহী সাতটি রুম বা কান্ধাতে একেক জোড়া করে রাখা হল বা মিলন ঘটিয়ে দেয়া হল। অর্থাৎ জৈষ্ঠের সঙ্গে জৈষ্ঠা, কনিষ্ঠের সঙ্গে কনিষ্ঠা এভাবে সর্ব কনিষ্ঠের সাথে সর্ব কনিষ্ঠার সঙ্গে বাসর দেয়া হল। মানব সৃষ্টির দ্বিতীয় স্তরের মানব মানবীদের এভাবে নিয়ে দেয়া হল।

মিলনের পরে সকলের সন্তানাদি হল। তারা বড় হতে লাগল। তখন পিলচু হাড়াম-পিলচু বুডহী আলোচনা করলেন যখন কোন মানুষ ছিল না, তখন আমরা মিলিত হলাম বলে সাত ছেলে ও সাত মেয়ের জন্ম দিয়েছিলাম এবং বংশ বৃদ্ধি করলাম। আর এই সন্তানদের আমরা ভাই-বোনে বিয়ে দিলাম। কিন্তু এখন আমরা এদেরকে জাত বা গোত্র নির্দিষ্ট করে দিব ভবিষ্যতে আর কোন দিন যেন আপন ভাই-বোনে বিয়ে না হয়। অর্থাৎ গোত্র নির্দিষ্টকরে দেয়া হবে এবং স্বগোত্রে আর কোন দিন বিয়ে দেয়া বা বিয়ে করা যাবে না। পিলচু হাড়াম-পিলচু বুডহী বিয়ে প্রাথমিক বিধান নির্দিষ্ট করে দিলেন। তারপরে তারা তাদেরকে গোত্র নির্দিষ্ট করে দিলেন। এটা নির্দিষ্ট করে দিলেন। এটা নিম্নরুপ ভাবে দেয়া হলো। অর্থাৎ তাদের সাত পুত্রকে সাত গোত্র দেয়া হলঃ

১ম পুত্রকে- হাসদা গোত্র

২য় পুত্রকে- মুরমু গোত্র

৩য় পুত্রকে- কিস্কু গোত্র

৪র্থ পুত্রকে- হেম্ব্রম গোত্র

৫ম পুত্রকে- মার্ডী গোত্র

৬ষ্ঠ পুত্রকে- সরেন গোত্র

৭ম পুত্রকে- টুডু গোত্র

গোত্র প্রদানের পর পিলচু হাড়াম পিলচু বুডহী তাদের সন্তানদের উপদেশ দিলেন। বিয়ের মাধ্যমে সম্পত্তির বন্ধন দিও কিন্তু কখনও কোনদিন স্বগোত্রে বিয়ে দিও না বা বিয়ে করিও না। যে কোন গোত্র থেকে বউ গ্রহণ করো ছেলে যেন অন্য গোত্রীয় হয়। তারপর থেকে এ বিধান তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে চলল ও পালন করতে লাগল। তারা থাকল, থাকতে থাকতে বহু বছর অতীত হলো এবং বিশাল জনসংখ্যা সৃষ্টি হল।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার কারণে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে হিহিড়ি-পিপিড়ি অঞ্চল ত্যাগ করে “খোজকামান” অঞ্চলে চলে আসল। মানুষ একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে দ্রুত হারে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়; ইদানিং কালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সূত্র আবিস্কার করা হয়েছে। যেমন প্রতি পঁচিশ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুন হয়। জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আজকের ১ কোটি পঁচিশ বছরে ২ কোটি হবে, পঞ্চাশ বছরে ৪ কোটি একশত বছরে ৮ কোটি হবে। অবশ্য এও বলা হয়ে থাকে, প্রকৃতি তার অতিরিক্ত জন সংখ্যাকে নিরোধ করে। কিন্তু মানব সৃষ্টি উষা লগ্নে প্রকৃতি ছিল উদার। সম্পদ ছিল অপরিমেয়। তাই তখন জনসংখ্যা চক্র বৃদ্ধিহারে বৃদ্ধি পেতে লাগল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ অবস্থানকে সাঁওতালী ভাষায় বলা হয় “মানওয়া মুউচ লেকাকো সাংগেআ” অর্থাৎ মানুষের জন্মহার পিপিলিকার মত বৃদ্ধি পেল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তাদের নৈতিক স্খলন ঘটল। মহিষ-মহিষীনির মত তাদের জৈবিক আচার হয়ে হয়ে পড়ল। মানুষ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারাল, জাতি গোষ্ঠীর প্রতি সম্মান, ভক্তির বিলোপ ঘটল। অধর্ম জীবন যাপন করতে লাগল। সত্য পথ থেকে তাদের বিচ্যুতি ঘটল। তাদের এই জীবন আচরণে ঠাকুরজীউ অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মানুষ যদি সত্েিযর পথে ন্যায়ের পথে ফিরে না আসে তাহলে মানবকুল ধ্বংস করে দিবেন। তখন তিনি প্রকট হলেন, মানব রুপ ধরে সকলকে আহবান করলে কাছে ডাকলেন এবং বললেন, তোমরা আমার কাছে আস, সত্যের পথে থাক, পাপ থেকে বিরত হও, ন্যায়ের পথে আস, শান্তির পথে থাক।

কিন্তু সেদিন খোঁজ কামানের হড় হপন ঠাকুরজিউ এর কথায় কর্ণপাত করেনি। তার আহবানকে অবজ্ঞা করে। কেবলমাত্র এক দম্পত্তি তারা সৎ ও ধার্মিক ছিল এবং ঠাকুরজিউকে ভয় করত। তারা সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে শ্বাশত জীবন যাপন করত। ঠাকুরজি এ দম্পত্তিকে ডেকে বললেন- মানওয়া (মানুষ) আমার কথায় কর্ণপাত করছে না, সেজন্য এদেরকে আমি ধ্বংশ করে দিব। তোমরা দুজন হারাত পর্বতের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর, তোমরা সেখানে রক্ষা পাবে।

এ দম্পত্তি ঠাকুরজিউ এর কথায় মনোযোগ দিল এবং হারাত পর্বতের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করল। তারা পর্বতের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করলে পর ঠাকুরজিউ একটানা সাতদিন সাত রাত বজ্রসহ বৃষ্টিপাত (সেংগেল দাও) বর্ষন করলেন। মানবকুল ধ্বংস হলো কেবলমাত্র সেই সৎ সম্পত্তি যারা হারাত পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিয়ে ছিল। তারাই জীবিত রইল। এ বেদনাদায়ক ঘটনাকে সমাজে স্মরণীয় করে রাখার জন্য পরবর্তীতে বাহা উৎসবে বাহা গানের সুরে গাওয়া হয়।

এয়ায় সিঞ এয়ায় ঞিনদা সেংগেল দাগে হো

এয়ায় সিঞ এয়ায় ঞিনদা জাদম জাদম হো

তোকারেবেন তাহেকানা মানেওয়া

তোকারেবেন সোড়োলেনা?

মেনাক মেনাক হারাতা হো

মেনাক মেনাক বুরু দান্দের হো

অনারেলিঞ তাহেকানা আলিঞদ

অনারেলিঞ সগেলেন

গানে সেংগেল দাআ এর এবং তার পরবর্তী ঘটনার প্রশ্ন ও উত্তর আকারে আছে। বেশ বগগান অনেক গাঁথার মত। এখানে কেবল আলোচনার ধারাবাহিকতার কেবল সূত্রপাত করা হল। গানের অনুবাদঃ

সাত দিন সাত রাত আগুন ঝরা বর্ষন হল

সাত দিন সাত রাত কোথায় ছিলে ওহে মানব

কোথায় ছিলে ওহে মানব

কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলে?

ঐ যে আছে হারাতা হে

ঐ যে আছে পর্বতের গুহা গো

ওখানে ছিলাম আমরা

সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম।

সেংগেল দা থামল, বন্যার জল নেমে গেল। তখন আশ্রয় গ্রহনকারী দম্পত্তি গিরি গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে। তারা দেখতে পেল একটি মহিষীনি মরে পড়ে আছে। তারপরে তারা দেখতে পেল একটি গাভী পড়ে আছে, গাভীটি কাড়কে গাছের গুড়িতে চাপা পগেড় আছে। গাভীটির একদিকে বজ্রপাতে পুড়ে গেছে আর অন্য পার্শ্বে অক্ষত আছে। এ দৃশ্যকে স্মরণীয় করার জন্য গাওয়া হলঃ

হুরুমে হুরুমে হো, গাইমা কাড়কেলো

ডিগিরে ডিগিরে, বিনদৗড়েন বিতকিল।

অনুবাদঃ

হাষ্টপুষ্ট গাভী কাড়কেলো গাছে চাপা পড়েছে।

এ ছাড়া আরো বিভিন্ন জানোয়ার তাদের চোখে পড়ল। পর্বতের গুহা থেকে বের হয়ে তারা হারাতা পর্বতের পাশেই বসতি স্থাপন করলো। ঠাকুরজি তাদেরকে নৈতিক শিক্ষা দিলেন। জীবনের সারিকে (সত্য) গ্রহণ করতে উপদেশ দিলেন। মিথ্যা পরিহার করার পরামর্শ দিলেন। সৎ জীবন যাপনের শিক্ষা দিলেন। তখন ঠাকুরজিউ তাদেরকে বস্ত্র দিলেন। তারপরে তাদের সন্তাদি হল। বহবছর অতীত হল। অনেক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেল।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তারা হারাতা অঞ্চল পরিত্যাগ করে “সাসাং বেডা” বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করল। এ অঞ্চলে তারা বহু যুগ কাটিয়ে দিল। এখানে হাড়াম-বুডহী আবারো তাদেরকে গোত্র প্রদান করলেন। আদি গোত্র হাসদা, মুরমু, কিস্কু, হেম্ব্রম , মার্ডী, সরেন ও টুডু দেওয়া হলো। এ সাতটি আদি গোত্র ছাড়াও আরো নতুন পাঁচটি গোত্র নামকরণ করা হল বা প্রদান করা হলো। সেগুলো হলো বাস্কে, বেসরা, পাউরিয়া, চঁড়ে আর অন্যটি হলো বেদেয়া। কারো কারো মতে সোয়ালিয়া মতান্তরের কারণ পডরবর্তীতে এ সম্পদায়ের নৈতিক অধপতের জন্য তারা নিজ এলাকা পরিত্যাগ অন্য এলাকা বা গ্রামে গিয়ে উল্লেখিত এগারোটির মধ্যে খুশিমত যে কোন একটি গোত্র গ্রহণ করে। এভাবে মূল গোত্র বেদেয়া বা সোয়ালিয়া গোত্র ত্যা গরে প্রচলিত গোত্র গ্রহণ করে তারা মূল স্রোতে মিশে যায়। এরা নাকি মার্ডী, মুরমু ও সরেন গোত্র গ্রহণ করে আদি গোত্র পরিত্যাগ করে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত SANTAL KHUIT বইয়ে উল্লেখ করেছে যে, আবার নতুন করে গোত্র ধারণ করার পরে ঘটনাকে স্মরণীয় করার জন্য গান বাধলঃ

হিহিড়ি পিপিড়ি রেবন জানামলেন

খঅচ কামান রেবন খঅচলেন

হারাতারেবন হারালেন

সাসাং বেডা রেবন জৗতএনা হো।

অনুবাদঃ

হিহিড়ি পিপিড়িতে মানব জন্ম

খঅচ কামানে মিলিত হই

হারাতায় আবার বংশবৃদ্ধি হয়

সাসাং বেডাতে গোত্র ধারণ করলাম।

সাসাং বেডাতে গ্রোত ধারণ করার পর বহুযুগ সেখানে বসবাস করছিল। পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে জারপী অঞ্চলে নতুন বসতি গড়ে তোলে। এখানে থাকতে থাকতে কেন যেন তারা স্থায়ী হতে পারল না। তারা সে অঞ্চল পরিত্যাগ করে নতুন অঞ্চলের সন্ধানে যাত্রা করল। তারা অরণ্যের মধ্যে দিয়ে ছোট ছোট পাহাড় টিলা অতিক্রম করে অগ্রসর হচ্ছে। বহদিন চলার পরে তারা এক বিরাট উচু পাহাড়ের পাদদেশে এসে হাজির হলো। তারা হাটতে হাটতে ক্লান্ত হলো, পাহাড় অক্রিমের কোন পথ খুঁজে পাচ্ছে না। পথ না পাওয়ার জন্য তারা বলাবলি করতে লাগল, এ পাহাড়ের দেবতা নিশ্চয় পথ বন্ধ করে রেখেছে, চল আমরা তাকে অর্ঘ্য দেওয়ার নিবেদন করি। কোন রকমে যেন আমাদেরকে যাওয়ার পথ উম্মক্ত করে দেয়। তখন তারা ঐ পাহাড়ের দেবতার কাছে নিবেদন করল, “হে মহান পাহাড়, যদি আমাদের এ পাহাড় অতিক্রমের পথ খুলে দাও, তাহলে আমরা নতুন অঞ্চল, বসতভূমি পাওয়ার পরেই তোমাকে পূজো দিব।” আশ্চর্য্য কিছুক্ষণ পর তারা ভোরের আলো দেখতে পেল। তারা মনে করল বোধহয় কেবল সকাল হয়েছে। কিন্তু তারা এর আগে কোন আলো বা পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। যখন তারা মহান পাহাড়ের দেবতার করুনায় পথ খুজে পেল এবং পাহাড় অতিক্রম করল তখন তারা দেখল সূর্য দেবতা পূর্বগগণে অনেক উপরে। অথচ পথ পাওয়ার আগে তারা মনে করছিল এ বুঝি কেবল সকাল হলো। যে পথ দিয়ে তারা অতিক্রম করল সে পথের নামকরণ করা হল “সিঞ দুয়ার” অর্থাৎ বদ্ধ দরজা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গান রচনা হলঃ

জারপি দিশাম খনাঃক ইঞদ

সিঞ দুয়ার, বাই ইঞদ

দিশাম হড়কো নডোং আকানা।

অনুবাদঃ

জারপি দেশ থেকে আমি

বদ্ধ দরজা বহু দরজা পার হয়ে

দেশের জনতা পেরিয়ে এল।

সিঞ দুয়ার অর্থাৎ বদ্ধ দরজা খোলার পরে যে পথে তারা যাত্রা শুরু করল সে পথ ছিল সংকীর্ণ অর্থাৎ পথটি যথেষ্ট চওড়া নয়। তাই পথের নামকরণ করা হল বাই রুয়ার অর্থাৎ বাহুর সমান। বর্ণনামতে স্মরণ করে দেয় ভারত প্রদেশের খাইবার গোলানের সংকীর্ণ গিরিপথ।

তারা পথ পরিক্রম করছে। অনেক দিন ধরে সেই গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করে চলেছে। তারা বহু দুয়ার অতিক্রম বিস্তার্ন দেশ পেল। তারা এদেশের নাম দিল “আয়রে”। এ আয়রে দেশে অনেক বছর বসবাস করল, তারপরে তারা কায়েনডে দেশে বসতি স্থাপন করল। সেখানে বহুযুগ বসবাস করার পরে তারা চায় দেশে নতুন বসতি গড়ে তুলে। সেখানে দীর্ঘকাল বসবাস করে। এখানে বসবাস করার সময় তাদের বিশাল জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে উর্বরভূমি চাষ করতে করতে তা অনুর্বর হয়ে গেল। ভূমির এ অনুর্বরতাকে সাওতালী ভাষায় “জম সাবাঃ” বলা হয়। আমের আঠি কিংবা তালের আশ চুষতে চুষতে যেমন তা ফেকাশে হয়ে এটাকে সাওতালী বাষায় বলা হয় ‘চপয়চ সাবাঃ’ অর্থাৎ চুষে ফেকাশে করা। ঠিক অনুরুপভাবে চাষ এলাকার মাটি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ঐ এলাকার মাটিতে ভাল ফসল পাওয়া যেত না। তখন তারা নতুন এলাকার সন্ধান করে। তাই তারা সাত নদীর বিধোত অঞ্চলে চলে আসে। তারা সে অঞ্চলের নাম করল “চাম্পা দিশাম”। সে দেশে প্রবেশের দুটি গিরিপথ ছিল। সে দেশে প্রবেশের প্রথম দরজাটি যেহেতা “চায়” দেশের প্রান্তে তাই এটাকে বলা হত “চায় দুয়ার”। এ পথের শেষ প্রান্তে যেখানে চাম্পা অঞ্চলে পদার্পন করা যায় সে গিরিপথের দরজাকে নামকরণ করা হল চাম্পা দুয়ার।

ইতিপূর্বে অনেক দেশ পরিক্রমার পর তারা মনের মত দেশ পেল। কৃষি ও পশুপালনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ দেশ। অল্প সময়ের মধ্যে তাদের জনে জনে পূর্ণতা পায়। চাম্পাতে তারা অনেক গড় প্রতিষ্ঠা করে। ভবিষ্যতে কোন শত্রু যেন তাদেরকে আক্রমন করে পরাজিত করতে না পারে। এ জন্য তারা গোত্রভিত্তিক আলাদা আলাদা গড় নির্মাণ করল। সেই গড় গুলির নাম নিম্নরুপঃ

1. হাসদা গোত্রের গড় হল- কুটামপুরি গড়

02. কিস্কু গোত্রের গড় হল- কঁয়েডা গড়

03. মুরমু গোত্রের গড় হল- চাম্পা গড়

04. হেম্ব্রম গোত্রের গড় হল- খয়রী গড়

05. মার্ডী গোত্রের গড় হল- বাদলী গড়

06. সরেন গোত্রের গড় হল- চায়বাহের গড়

07. টুডু গোত্রের গড় হল- লুইবাড়ী লুকুইবাড়ী গড়

08. বেসরা গোত্রের গড় হল- বনসারিয়া গড়

09. বাস্কে গোত্রের গড় হল- হারবালয়ং গড়

1. পাউরিয়া গোত্রের গড় হল- বামা গড়
2. চঁড়ে গোত্রের গড় হল- জাংগেকোডে গড়
3. সোয়ালী গোত্রের গড় হল- হলাংগাডা গড়

চাম্পাতে তারা বহু যুগ বসবাস করে এবং সেখানে তাদের উন্নতির শোর্য-বীর্য লাভ করে। সে দেশে স্বাধীন ছিল। কারো পায়ের নীচে ছিল না। তাদের সামাজিক প্রশাসন নিম্নরূপে ছিলঃ

কিস্কু রাজা ও প্রশাসনিক কাজে ছিল। মুরমু সমপ্রদায় বহু আগে থেকে পূজারী বা পুরোহিত ছিল। আমারা তাদেরকে মুরমু ঠাকুর বলতাম। সরেনরা ছিল পাইকান অর্থাৎ সৈনিক বা যোদ্ধা। হেম্ব্রমরা ছিল কুয়ার বা দেওয়ান মার্ডী গোত্র ছিল কৃষক বা ধনীপতি। টুডু গোত্র বাদ্যকর এবং তৎসঙ্গে লৌহজাত কর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। বাস্কেরা ছিল ব্যবসায়ী। তারা কেনা-বেচা করত। অবশিষ্ট গোত্ররা সমাজের বিভিন্ন কাজ করত। আসলে তারা নির্দিষ্ট কি কাজ করত তা আমরা গেছি।

চাম্পাতে থাকাকালীন তারা মারাং বুরু (মহান দেবতা) মড়েকো- তুরুইকে (পঞ্চ ও ষষ্ঠ দেবতা) এবং পাড়ার কুলহির প্রান্তে জাহের এরা দেবী প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং পূজা পাঠাদি প্রবর্তন করা হয়। “সিঞ বোঙ্গা” বা সূর্য দেবতার পূর্জ করা হত তবে তা পাঁচ বছর অন্তর পূঁজা হত এবং তা সূর্য উদয় কালিন পূঁজা করা হত।

মারে হাপড়াম অর্থাৎ প্রাচীনরা পুরা কাহিনীতে বলে থাকেন যে, প্রাচীনকালে যখন রাম রাজা ছিলেন তখন সব ‘খেরোয়াড়’[3] গোষ্ঠী রামের সঙ্গে লংকায় রাবনকে পরাজিত করার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এজন্য তখন থেকে বহুযুগ পর্যন্ত দেকো/দিকুদের সঙ্গে কোন যুদ্ধ বা লড়াই ছিল না।

তারা সমতল ভূমিতে থাকত আর খেরোয়াড়রা বনের কাছাকাছি কিংবা পাহাড়ী এলাকায় বসবাস করত। কিন্তু পরবর্তীতে দিকোদের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। কখনো খেরোয়াড় জিতেছে কখনো দিকোরা জিতেছে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ হয়েছে। এজন্য আজ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আমাদের সুখ নেই। আমরা যখন কোন দেশকে আবাদযোগ্য করে তুলি, তখন দিকুরা এসে আমাদের জায়গাজমি কেড়ে নেয়।

ইদানিংকালে ছোট নাগপুর ও সাঁওতাল পরগনা এলাকায় বসবাস করা কালীন যদি ইংরেজ রাজ দিকুদের সহযোগিতা না করত তাহলে তাদেরকে গঙ্গা পার করে দিতাম। হুলের মাধ্যমে আরা আমাদের গঙ্গা নদীকে পূর্বদিকে সীমানা করতে চেয়েছিলাম। কারণ প্রাচীনকালে গঙ্গার তীর থেকে বিস্তীর্ণ পশ্চিম দিকে বহুদুর পর্যন্ত আমাদের দখলে ছিল। এ প্রসঙ্গে বহুল প্রচলিত গান আছে, তা নিম্নরুপঃ

গাং নাই দ পেরেচ এনা

মড়া নাই দ চড়াং এনা

দোজা মিরু রুয়াড়মে

চেলে ঞেলতেঞ রুয়াড় আ?

গাতেঞ রেগে মাতা হেদেঞআ

নাজিঞ নামার গোসাঞ হো

মোড়া নাইদ দরো বতোলো।

গাজিঞ নামর গোসাই হো

তেংগআলাং সুমাম গানারী

নাজিঞ নামার গোসাঞ

গালাংঅলাং রাংকি জানালোম

নাজিঞ নামার গোসাঞ হো

ঝালি আলাং মলে ইচাঃ

নাজিং নামার গোসাই হো

গারি আলাং জালে মাংগাউরী।

চাম্পা দেশে প্রথম দিকুদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে প্রথম বারে খেরোয়াড়রা হেরে যায় এবং দিকুরা চাম্পাগাড় দখল করে। পরবর্তীতে খেরোয়াড়রা পুনরায় অধিকার করে। দিকুরা যুদ্ধে হেরে যাবার পর তারা তা দখলের চেষ্টাকরে। এ উপলক্ষে দিকু রাজা ও বোনের মধ্যে এরূপ একটা কথপোকথন হচ্ছিন। দিকু রাজার ছিলেন দুই ভাই তাদের একজনের নাম ইন্দন সিং অপর জনের নাম মান্দান সিং। তাই কথপোকথন ছিল নিম্নরুপঃ

দাদারে ইন্দন সিং মান্দান সিং

ছুটালোম চাম্পাকা গাড়

বহিনগে না কান্দ না খিজো

বহিনগে হাতে কা মাখো বেচং

বহিনগে কানেকা সোনা বেচং

বহিনগে যাও হোনা লিবো চাম্পাগাড়।

প্রসঙ্গতে উল্লেখ যে, খেরোয়াড়দের ১২টি গোত্রের ১২টি গড় ছিল এবং গোত্রীয় ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারিত করা ছিল। পরবর্তীতে কিছু গোত্রের মধ্যে এ সীমানা নিয়ে বিরোধ বাধে এবং পারস্পারিক নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। যেমন কিস্কুদের সঙ্গে মার্ডীদের সীমানা নিয়ে বিরোধ বাধে এবং যুদ্ধ হয় অপর দিকে বেশরা ও টুডুদের মধ্যে বিবাহের কারণে মতবিরোধ ঘটে এবং যুদ্ধ বেধে যায়। এ ঘটনাকে গানের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়ঃ

বেরেত বেরেত বেরেত মেসে গাতেঞ হো

চিরগাল চিরগাল চিরাগাল মেসে গাতেঞ হো

কঁমডাকো মাপাঃ গুজুঃ কান

বেরেত বেরেত বেরেত মেসে গাতেঞ হো

চিরগাল চিরগাল চিরাগাল মেসে গাতেঞ হো

বাদলীকো ঞেপেত গপচ কান

চেতে লাগিত মাপাঃ কানা গাতেঞ হো

চেতে লাগিত গপচকানা গাতেঞ হো

চেতে লাগিত ঞেপেত গপচ কান?

সীমা লাগিত মাপা কানা গাতেঞ হো

ডান্ডি লাগি গপচ কানা গাতেঞ হো

ডান্ডি লাগিত ঞেপেত গপচকান।

অনুবাদঃ

জাগ জাগ জাগ হে প্রিয়তম

উঠ উঠ উঠ হে প্রিয়তম

কঁয়ডাগন[4] যুদ্ধে মারা যায়

জাগ জাগ জাগ হে প্রিয়তম

উঠ উঠ উঠ হে প্রিয়তম

বাদলীগণ[5] তীরের আঘাতে মারা যায়

কিসের লাগি যুদ্ধ করে প্রিয়তমা

কিসের লাগি কত মরে প্রিয়তমা

কিসের লাগি বানে মরে তারা গো?

সীমার জন্য কতল করছে প্রিয়তম

বসতভিটার জন্য যুদ্ধ করে প্রিয়তম

বসত ভিটার জন্য বান মারছে প্রিয়তম

চাম্পা পর্যন্ত মুন্ডা, বিরহড়, কুর্মী, মাহলে ইত্যাদি ১৪টি সমপ্রদায় আমরা খেরোয়াড় জাতী হিসাবে একসঙ্গেই ছিলাম। বীরহড়রা হনুমানের মাংস ভক্ষণ করার কারণে তাদেরকে সমাজচ্যুত (বিটলাহা) করা হয়। তাই অদ্যাবধি তারা হড়দের থেকে বিছিন্ন হয়ে গভীর জঙ্গেলে বসবাস করে। মুন্ডা সমপ্রদায়ও চাম্পাতে পরবর্তীকালে আলাদা হয়ে যায়। ইহার বহুপরে কুর্মীরাও দিনে দিনে দিকুর মত হয়ে গেল। কিছু খেরোয়াড় দিকু সিংদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে। তখন তাদের বংশধরগন পরবর্তীতে সিং হয়ে যায়। এখনো প্রাচীন স্থানে অনেক সিং রাজা হয়ে আছে। বীরহড়দের মধ্যে সিং হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে এখানো অনেকে রাজা-জমিদার হয়ে আছে। কথিত আছে, প্রাচীন কালে এক সিং যুবক কিস্কু রাজাদের বাড়ীতে কাজ কর্ম করত এবং কিস্কু রাজার মেয়ের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক হয় এবং রাজকন্যা গর্ভবতী হয়। পরে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে গোপনে উক্ত সন্তাকে জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়। তখন মার্ডী গোত্রের লোক উক্ত সন্তানটিকে (বাডহা করে) কুড়িয়ে আনে। তাদের কাছেই সন্তানটি বয়োপ্রাপ্ত হয়; তার নাম রাখা হয় মাধো সিং। মাধব সিং যুবা প্রাপ্ত হলে পর সে মহাশক্তিশালী বীর যুবক হয়। বুদ্ধিমত্তা ও লড়াই কৌশলে তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। সে কিস্কু রাজার দেওয়ান নিযুক্ত হয়। একদিন রাজার কাছে বিয়ের বাসনা প্রকাশ করে। রাজা পরিষদ ও অন্যান্য সম্মানীত ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে মাধসিং এর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসলেন। কিন্তু কোন গোত্রের মাধসিং, কে কন্যা সমপ্রদান করতে রাজী হল না। কারণ তার কোন গোত্র পরিচয় ছিল না। প্রকাশ থাকে যে, খেরোয়াড়গণ স্বগোত্র ব্যক্তিত অন্য ১১টি গোত্রের মধ্যেই কন্যা সমপ্রদান করে থাকে।

তাদের সিদ্ধান্ত জানার পরে মাধ সিং অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং ঘোষণা দিলেন তোমরা যদি আমাকে কন্যা সমপ্রদান না করো তাহলে একে একে সব কুমারী মেয়েদের ইতুত (কপালে সিদুর ঘষা দিয়ে) করে (ডনড) নষ্ট করে দিব। দেশের লোকজন তার এ ঘোষণা শুনে মান ইজ্জতের ভয়ে আতংকিত হয়ে যায়। তখন তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে রাজার অধীনে বা রাজ্যে ধর্ম রক্ষা পায় না, মানুষের ইজ্জত থাকে না সে রাজার অধীনে বা বাস করা যায় না। তাই তারা চাম্পা রাজ্য থেকে পালিয়ে যায়। কিছু লোক ক্ষমতা ও সম্পদের লোভে চাম্পাতে থেকে যায়।

চাম্পা থেকে তড়ে পুখুরী বাহা বান্দেলায় অঞ্চলে পালিয়ে এসে বসতি স্থাপন করে। এখানে তারা দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করে। এ অঞ্চলে তাদের রাজা নেই। গ্রাম ভিত্তিক সামাজিক জীবন যাপন করতে থাকে। এখানে দিকুরা আমাদের বসতি এলাকায় প্রবেশ করে। তখন সমাজের প্রধান ব্যক্তিগণ তপে সারজম[6], লাবাড় আতনা[7], লাডেয়া মাতকম[8] গাছের নীচে পদ্ম পাতায় আসন করে কেরে ডাডির[9] জলপান করে ১২ মাস আচার বিচার করে এ মহাসভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে অদ্য থেকে নবজাতকের ক্ষেত্রে ছাটিয়ারে (জাতে তোলা) বিয়েতে অনুষ্ঠানে, শোকের দিনে, মরণের দিনে আজকে আমরা যেভাবে দিগর জনগণ বসে আলাপ-আলোচনায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছি উল্লেখিত দিন গুলোতে আমরা পাড়ার গ্রামের লোকজন বসে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে সমাজের সব কর্ম সমাধান করব। এ মহাসভায় সিদ্ধান্ত হয় যে হড় হপনদের সামাজিক জীবন মানজহী পরিষদ ভিত্তিক পরিচালিত হবে। কারণ এখন আমাদের রাজা নেই জাতীর দিক নির্দেশনা দেয়ার কেউ নেই। তাই গ্রাম ভিত্তিক মানজি পরিষদ ও আঞ্চলিক ভিত্তিতে মানজহী পারগানারাই সমাজ পরিচালনা করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। চাম্পা দিশম এ রাজা ছিল বলে রাজার আদেশ নির্দেশে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয়, সেহেতু এখন রাজা নেই তাই মানজহী পরিষদ সমাজিক জীবনে প্রধান কর্ণধার। যে দেশ বা যে অঞ্চলোই হড় হপনরা বসতি করুক মানজহী পরিষদ ভিত্তিক তাদের সমাজ পরিচালিত। এভাবে রাজ্য হাজার জন্য তারা প্রাচীন নিয়ম আচার পরিবর্তন করে সমাজে কিছু সংস্কার গ্রহণ করে। ইতোমধ্যে দিকুদের সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করার জন্য সংস্কৃতির বিনিময় হয়। কিছু কিছু বিষয় গ্রহণ ও বর্জন করা হয়। যেমন পাতা অর্থাৎ চড়ক পূর্জা, ছাতা পূজা ও মৃতের অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন আমরা দিকুদের নিকট হতে গ্রহণ করি।

মহাসভা সমাপ্ত হলে তারা তড়ে পুখুরী, বাহা বান্দেলায় এর জলরা শির পদ্ম পাতার উপর দিয়ে হেটে তা অতিক্রম করল। পুরুষরা ইচাঃ গাছের নীচে আর মহিলারা মহুয়া গাছের নীচে উঠে আসল। তখন তারা লক্ষ্য করল যে তাদের পায়ের পাতা ভিজে নাই এবং পদ্ম পাতাও ভেঙ্গে বা ছিড়ে যায়নি। এ জন্য তাদের স্থির বিশ্বাস হলো যে, আমরা বিচার আচার করে যে বিধি-বিধান নির্ণয় করলাম প্রথম কর্মে তা সত্য বলেই প্রতিগত হলো। এ বিধি বিধান সর্বযুগে সর্ব কালে রাং এর মত উজ্জল হয়ে থাকুক। মহাসভার পরে নব বিধান মতে তারা সে অঞ্চলে বহু বছর যাবৎ বসবাস করে।

বহু বছর অতিবাহিত হওয়ার পরে কি কারণে যেন তারা সে অঞ্চল পরিত্যাগ করে। জনশ্রুতি ছিল যে তারা তুরুকের আগমনের ফলে তারা সে অঞ্চল পরিত্যাগ করে। নতুন অঞ্চলে আগমনের পথে তারা “বারী বাডোয়াঃ নামক এক মহা অরণ্যের সম্মুখীন। এ মহাঅরণ্যে আগে ভাগে কেউ অগ্রসর হতে রাজী হচ্ছে না। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, আমরা কেউ এককভাবে সামনে যাব না, সকলে পাশাপাশি এগুবো। এভাবে পাশাপাশি করে এ “বারী বাডোয়া” মহা অরণ্য অতিক্রম করে। জঙ্গল অতিক্রম করে যে নতুন এলাকায় পদার্পণ করলো, সে এলাকার নামকরণ করা হলো ‘জোনা জসপুর’। সমগ্র জনতা জঙ্গল থেকে বের হয়ে একত্রিত হলে তারা পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করল ‘চেলে জতবো পারমেনা সে বাংআ’? অর্থাৎ আমরা কি সকলে পার হয়ে এলাম কিনা? সে “জনা জমপুর” অঞ্চলে দীর্ঘকাল বসবাস করার পর তারা সে অঞ্চলও পরিত্যাগ করে তারা চলে গেল “খাসপাল ভেলাওজা”। এখানে এসে তারা আবার নতুন জীবন শুরু করে। নতুন নতুন গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে মানজহী পরিষদ ভিত্তিক গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে বহুকাল বসবাস করে। তারপরে এ দেশ থেকে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ গেল ‘শির’ অঞ্চলে, কেউ গেল ‘শিরার’ অঞ্চলে আবার কেউ নাগপুর অঞ্চলে। এ খাসপাল ভেলাওজা থেকেই হড়হপনদের মহাজোট ভাঙ্গনের শুরু হয়। তখন থেকে তারা পরাধীন হলো অর্থাৎ ‘দিকুদের অধীনে বসবাস করতে থাকে। কেবলমাত্র যে সকল খেরোয়াড় দিকুদের সঙ্গে যোগসাজস রক্ষা করল এবং বীর হড়দের মধ্যে অনেকে রাজা ও জমিদার হয়ে থাকল। ইতো মধ্যে কি কারণে যেন আমাদের খেরোয়াড় নামটিও হারিয়ে গেল। পূরুষদের জনশ্রুতি হতে জানা যায় শিকার দেশের পরপারে “সাআত” দেশে দীর্ঘকাল বসবাস করার জন্য খেরোয়াড়দের নতুন নাম করণ করা “সাওতাড়” বা “সাওতাল”।

শিকার রাজ্যের সমস্ত বনাঞ্চল পরিস্কার করে তারা সে ভূমিকে আবাদযোগ্য করে তোলে। শিকার রাজার অধীনে অনেক গ্রামের বহুজন এলাকার প্রধান ব্যক্তি হিসাবে মর্যাদা লাভ করে। কিন্তু তারপরেও দিকুরা তাদেরকে সে অঞ্চল হতে বিতাড়িত করে এবং তাদের ভিটে মাটি, জমি-জায়গা দখল করে নেয়। শিকার দেশে বসবাস করার সময় হড়হপনরা সেদেশের রাজার নিকট হতে “চাড়া পরব” পালনের স্বীকৃতি অর্জন করে। তখন থেকে অদ্যবধি হড়হপনদের মধ্যে আশ্বিন-কার্তিক মাসে ছাতা পরব পালন করা হয়ে থাকে।

জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ‘শিকার’ অঞ্চল থেকে ‘চুন্ডি’ অঞ্চলে চলে আসে। কারণ ‘খাসপাল ভেলাওজা’ অঞ্চল থেকেই তাদের বিপর্যয় শুরু হয়। আজকে তাদের জীবনে আমরা কোথায় বসবাস করব অর্থাৎ আমাদের মাতৃভূমি কোথায় হবে? আজকে আমাদের ঠাঁই নেই। আমাদের পূর্ব পুরুষগণ উপদেশ দিয়েছিল, “তোমরা অজয় নদী অতিক্রম করবে না, আর কেউ যদি অতিক্রম করো, তবে পেটের সন্তানকে চিমটি কেটে দিও! কারণ ঐ দেশ হচ্ছে তুরুকদের দেশ, ভন্ড মানুষের দেশ।” কিন্তু বিধিবাম আজকে আমরা পেটের জ্বালায় এদেশে এসেছি মুরুব্বী পূর্ব পুরুষদের উপদেশ রক্ষা করতে পারিনি।

তারপরে দিনে দিনে আমরা সাঁওতাল পরগনায় প্রবেশ করলাম। রেশম গুটি পোকা যেমন পাতায় খাদ্যের জন্য ডালে ডালে পাতায় পাতায় পরিভ্রমন করে ঠিক তদ্রুপ আমরা বাঁচার তাগিয়ে এক অঞ্চল থেকে আর এক অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসেছি এবং এখনো আছি। হয়তো আরো একদিন আবার অন্য কোন অঞ্চলে চলে যেতে হবে। ইতোমধ্যে কিছু লোক গঙ্গা পার হয়ে গেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও আসামে দেশান্তরী হয়েছে।

এ অবস্থায় তারা আক্ষেপ করে বলে “চেত ইয়াতেচং ঠাকুর নংকায় ডামাডোল কেত লেয়া” অর্থাৎ কি কারণে যেন ঠাকুর আমাদের এ ডামাডোল করলেন।

এ পুরা কাহিনী সন্তানদের “চাচো ছাটিয়ারে (জাত সংস্কার অনুষ্ঠানে), শ্রাদ্ধে ও কারাম অনুষ্ঠানে বিন্তি গুরু বর্ণনা করেন এবং বর্ণনার মাঝে মাঝে অনেক প্রচলিত গান গেয়ে
fote alom
fote alom
তারকা সদস্য
তারকা সদস্য

লিঙ্গ : Male
পোষ্ট : 129
রেপুটেশন : 0
শুভ জন্মদিন : 10/03/1956
নিবন্ধন তারিখ : 27/05/2011
বয়স : 63
অবস্থান : রাশিয়া
পেশা : বিজনেস
মনোভাব : কাইউতা

Back to top Go down

Back to top


 
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum