Melbondhon
এখানে আপনার নাম এবং ইমেলএড্রেস দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন অথবা নাম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন
widgeo

http://melbondhon.yours.tv
CLOCK
Time in Kolkata:

সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)

Go down

সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)  Empty সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)

Post by imam1979 on 2011-07-29, 22:25

(১-৩ নং আয়াত)
সূরা নিসায় মোট ১৭৬ টি আয়াত রয়েছে। এ
আয়াতগুলো মদীনায় নাজিল হয়েছিল। এই সূরার অধিকাংশ আয়াতে পরিবারে মহিলাদের
অধিকার এবং পারিবারিক বিষয়ে বক্তব্য থাকায় এর নাম হয়েছে সূরা নিসা।
সূরা
নিসার এক নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয়
কর। যিনি তোমাদের একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সহধর্মিনী
সৃষ্টি করেছেন। যিনি তাদের দু'জন থেকে পৃথিবীতে বহু নর-নারী বিস্তার
করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর,যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে আবেদন কর।
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ
দৃষ্টি রাখেন।"

সূরা নিসার প্রথম আয়াতেই দু'দু'বার
খোদাভীরু হবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্ম প্রাথমিক শিক্ষা
পরিবারেই হয়ে থাকে। তাই পরিবারের এই সব ভিত্তি যদি আল্লাহর আইন অনুযায়ী না
হয়,তাহলে ব্যক্তি ও সমাজের মানসিক সুস্থতা বলতে কিছুই থাকবে না। আল্লাহ
মানুষের মধ্যে নিজেকেই বড় ভাবার যে কোন ইচ্ছা বা ঝোঁক প্রবণতাকে
প্রত্যাখ্যান করে বলছেন,সমস্ত মানুষকে একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে।
তাই বংশ,বর্ণ ও ভাষাকে শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষণ মনে না করে বরং খোদাভীরু হওয়াকে
শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি মনে করা উচিত। এমনকি নারী ও পুরুষের মধ্যে মানসিক এবং
দৈহিক পার্থক্য সত্ত্বেও তাদের কেউই একে অপরের চেয়ে বড় নয়। কারণ সমস্ত
নারী ও পুরুষ একজন পুরুষ এবং নারী থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে। পবিত্র কোরআনের
অন্য এক আয়াতে আল্লাহর আনুগত্যের পরই বাবা-মায়ের প্রতি আনুগত্যের কথা বলা
হয়েছে। এভাবে তাদের উচ্চ মর্যাদার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। আর এই আয়াতে
আল্লাহর নামের পর সমস্ত আত্মীয় স্বজনদের অধিকার রক্ষার আহবান জানানো হয়েছে
এবং তাদের প্রতি যাতে কোন রকম অবিচার করা না হয় সে দিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে
বলা হয়েছে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : ইসলাম একটি
সামাজিক ধর্ম। তাই এ ধর্মে সমাজ ও পরিবারে পরস্পরের সম্পর্কের প্রতি
গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। খোদাভীরু হবার জন্যে এবং আল্লাহর ইবাদত তথা দাসত্ব
করার জন্যে অন্যদের অধিকার রক্ষা জরুরী।
দ্বিতীয়ত : মানব সমাজকে অবশ্যই
ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং প্রত্যেক মানুষকেই মানব সমাজের সম্মানিত সদস্য হিসেবে
ধরে নিয়ে অন্যদের সমান অধিকার দিতে হবে। কারণ,মানুষের মধ্যে
অঞ্চল,বর্ণ,গোষ্ঠী ও ভাষার ভিত্তিতে বৈষম্য করা নিষিদ্ধ। আল্লাহ প্রত্যেক
মানুষকেই একই উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছেন।
তৃতীয়ত : গোটা মানব জাতি একে
অপরের আত্মীয়। কারণ,তাদের সবার আদি পিতা ও মাতা ছিলেন হযরত আদম (আঃ) এবং
বিবি হাওয়া। তাই সব মানুষকেই ভালবাসতে হবে এবং তাদেরকে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়
স্বজনের মতই শ্রদ্ধা করতে হবে।

এবারে সূরা নিসার দুই নম্বর আয়াত নিয়ে
আলোচনা করবো। এই আয়াতে বলা হয়েছে-"এতিমদের প্রাপ্য সম্পদ তাদেরকে
দাও,নিজেদের খারাপ সম্পদ এতিমদের দিয়ে এতিমদের ভালো সম্পদ কেড়ে নিও না।
তাদের সম্পদ তোমাদের সম্পদের সাথে মিশিয়ে গ্রাস করো না। নিশ্চয়ই এটা মহা
পাপ।"
এই আয়াতে এতিমদের সম্পদ আত্মসাৎ করা অথবা ইসলামী উত্তরাধিকার আইন
অনুযায়ী এতিমদের যতটুকু সম্পদ পাওনা তার চেয়ে কম দেয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একই সাথে এতিমদের ভালো সম্পদ নিয়ে এর বিনিময়ে তাদেরকে নিজের কম মূল্যবান
সম্পদ দেয়া এবং যে কোন পন্থায় তাদের সম্পদ গ্রাস করাকেও মহাপাপ বলে উল্লেখ
করা হয়েছে। কারণ,এতিমের অভিভাবকরা হল তাদের ধন সম্পদের আমানতদার এবং এতিম
শিশুরা বড় হলে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দেয়াও এ সব অভিভাবকদের দায়িত্ব। তাই
এতিমদের সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করে যাচ্ছে তাই কাজ করা যাবে না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
এক. এতিমদের সম্পদ অবশ্যই তাদেরকে দিতে হবে। তারা তাদের সম্পদের কথা না জানলেও অথবা ভুলে গেলেও এটাই অভিভাবকদের কর্তব্য।
দুই. শিশুরাও সম্পদের মালিক হয়। অবশ্য তারা প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত নিজস্ব সম্পদ দখলের অধিকার রাখে না।
তিন. ইসলাম বঞ্চিত ও অভিভাবকহীন ব্যক্তিদের প্রতি গুরুত্ব দেয় এবং তাদের সহায়তা করে।
এবারে
সূরা নিসার তিন নম্বর আয়াতের দিকে নজর দিচ্ছি। এ আয়াতে বলা হয়েছে-"যদি
তোমরা এতিম কন্যাদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না বলে আশঙ্কা কর,তাহলে
তাদেরকে বিয়ে করোনা এবং পবিত্র ও পছন্দনীয় নারীদের মধ্য থেকে দু'জন,তিনজন
বা চারজনকে বিয়ে কর। কিন্তু যদি আশঙ্কা কর ন্যায় বিচার করতে পারবে না,তাহলে
একটি মাত্র বিয়ে করবে,অথবা তাও যদি না পার ,তবে তোমাদের অধিকারভূক্ত
দাসীদেরকে বিয়ে করবে,এতে অবিচার না হবার সম্ভাবনা বেশী। "

এতিম সংক্রান্ত আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই
আয়াতে এতিম কন্যাদের কথা বলা হয়েছে। এতিম কন্যাদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ
করার কারণ হলো তারা এতিম ছেলে শিশুদের তুলনায় বেশী বঞ্চিত ও অত্যাচারের
শিকার হয়। তাই ন্যায় বিচারক মহান আল্লাহ বলছেন, এতিম কন্যাদের ওপর যে কোন
অন্যায় আচরণ নিষিদ্ধ। অনেক স্বার্থান্বেষী মানুষ এতিম কন্যাদের সম্পত্তি
দখলের জন্য তাদেরকে বিয়ে করতে চায় এবং এ জন্যে সব ধরনের কূটকৌশলের আশ্রয়
নেয়। কিন্তু আল্লাহ বলছেন,তোমরা এতিম কন্যাদের বিয়ে করার ফলে তাদের প্রতি
যদি সামান্য জুলুমেরও আশঙ্কা থাকে,তবে তাদের বিয়ে করো না।
বিভিন্ন
সূত্রের বর্ণনায় বলা হয়েছে,এক শ্রেণীর লোভী মানুষ এতিম কন্যাদেরকে লালন
পালনের নামে নিজেদের ঘরে নিয়ে আসতো এবং কিছুকাল পর ওইসব কন্যাদেরকে বিয়ে
করে তাদের সম্পত্তি দখল করতো। তাদেরকে বিয়ের মোহরানাও প্রচলিত রীতির তুলনায়
অত্যন্ত কম দেয়া হতো। এ অবস্থায় এতিম কন্যাদের ওপর যে কোন অবিচারকে
নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এই আয়াতসহ সূরা নিসার ১২৭ নম্বর আয়াত নাজিল হয়। বহু
পুরুষ তাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অথবা চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে এতিম কন্যাদেরকে
বিয়ে করতো। আল্লাহ তাদের মর্যাদা রক্ষার জন্য এ সব পুরুষদের উদ্দেশ্যে
বলেছেন,যদি নতুন বিয়ের ইচ্ছে থাকে তাহলে কেন শুধু এতিম কন্যাদের দিকে
দৃষ্টি দিচ্ছ ? অন্যান্য মেয়েদেরকেও বিয়ের প্রস্তাব দাও অথবা অন্তত তোমাদের
অধিকারভুক্ত দাসীদেরকেই বিয়ে কর। এই আয়াতে পুরুষদেরকে চারটি বিয়ের অনুমতি
দেয়া হয়েছে,যদিও এই রীতি ইসলামের আবিস্কার নয় বরং সামাজিক কারণে চার বিবাহ
কোন কোন অবস্থায় অতীতের মত এ যুগেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
আসলে ইসলাম ধর্ম বহু বিবাহ প্রথা চালু করেনি,বরং সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে
বিরাজমান এই প্রথাকে বিশেষ নিয়মের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত করেছে। ইসলাম
এক্ষেত্রে অর্থাৎ একাধিক বা চার বিবাহের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়
বিচার প্রতিষ্ঠার শর্ত বেঁধে দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে আল্লাহ
স্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছেন,"যদি তোমরা স্ত্রীদের সবার সাথে সমান ও ন্যায় আচরণ
করতে পারবে না বলে ভয় কর,তাহলে একের বেশী স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ নয়।"
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
এক.এতিম
কন্যাদের সম্পদ ও সম্মান নিয়ে হেলাফেলা বন্ধের জন্য তাদের সাথে সব সময়
এমনকি বিয়ের সময়ও ন্যায় বিচার করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।
দুই.স্বামী ও স্ত্রী নির্বাচনের অন্যতম শর্ত হলো,অন্তর দিয়ে পছন্দ করা পুরুষকে জোরপূর্বক কারো সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করা বৈধ নয়।
তিন.
একই সাথে চার জন স্ত্রী রাখা ইসলাম ধর্মে স্বীকৃত । কিন্তু কোন কোন পুরুষ
যদি এ আইনের অপব্যবহার করে,তাহলে এ আইনটি ভাল নয় এমন বলা যাবে না। বরং এটা
সমাজের বিশেষ প্রয়োজন বা চাহিদা মেটানোর প্রতি ইসলাম ধর্মের উদার নীতির
প্রকাশ।


(৪-৬ নং আয়াত)

আজ চার থেকে ছয় আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত
ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। তো প্রথমে চার নং আয়াতের অর্থ জানা যাক। এতে
বলা হয়েছে, "তোমরা নারীগণকে তাদের মোহরানা বা একটা নির্দিষ্ট উপহার দিবে।
যদি তারা সন্তুষ্টচিত্তে মোহরানার কিছু অংশ ছেড়ে দেয়,তোমরা তা স্বাচ্ছন্দে
ভোগ করবে।"

গত পর্বে আমরা বলেছিলাম সূরা নিসার
আয়াতগুলো শুরু হয়েছে পারিবারিক বিধি বিধানের বর্ণনা দিয়ে। পরিবার গঠন বা
বিয়ের সময় বরের পক্ষ থেকে নববধুকে মোহরানা দেয়ার রীতি সব জাতির মধ্যেই
প্রচলিত রয়েছে। দুঃখজনকভাবে কোন কোন জাতির মধ্যে বিশেষ করে ইসলামের
আবির্ভাবের আগে আরবদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে মহিলাদের কোন মর্যাদা ছিল
না। সে সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষরা স্ত্রীদেরকে মোহরানা দিত না অথবা
দিলেও পরে তা জোর করে ফেরত নিত। পবিত্র কোরআন নারীর পারিবারিক অধিকার
রক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে মোহরানা পরিশোধ করতে বিবাহিত
পুরুষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে এবং এ ব্যাপারে সব ধরনের কঠোরতা ও কর্কশ আচরণ
পরিহার করতে বলেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ এও বলছেন,"মোহরানা ফিরিয়ে নেয়া
বা এর অংশবিশেষ ফিরিয়ে নেয়াও তোমাদের জন্য বৈধ নয়। যদি তারা অর্থাৎ
স্ত্রীরা নিজেরাই খুশী মনে মোহরানার কিছু অংশ ফিরিয়ে দিতে চায়, তাহলে তা
গ্রহণ করা যেতে পারে।" এই আয়াতে উল্লেখিত না হলেও শব্দটির অর্থ হলো,মৌচাকের
মৌমাছি। মৌমাছি যেমন কোন স্বার্থের আশা না করেই মানুষকে মধু দেয়,সে রকম
পুরুষেরও উচিত জীবনসঙ্গীকে দাম্পত্য জীবনের মধু হিসেবেই মোহরানা দেয়া। আর
যা উপহার হিসেবে দেয়া হয়,তা ফিরে পাবার আশা করা কি অন্যায় নয় ?

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত
: স্ত্রীর প্রাপ্য মোহরানা তার ক্রয় মূল্য নয়,বরং এটা স্ত্রীর প্রতি
স্বামীর ভালবাসার নিদর্শন ও উপহার । কোরআনের আয়াতে 'মোহরানা' শব্দটিকে বলা
হয়েছে, যা সাদাক্কাত বা আন্তরিকতা শব্দ থেকে উদ্ভূত।
দ্বিতীয়ত : মোহরানা স্ত্রীর অধিকার এবং স্ত্রী-ই এর মালিক। স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া যেমন বন্ধ রাখা যায় না,তেমনি তা ফেরতও নেয়া যায় না।
তৃতীয়ত : মোহরানা মাফ করার জন্য স্ত্রীর বাহ্যিক সন্তুষ্টি যথেষ্ট নয়। এজন্যে স্ত্রীর প্রকৃত বা আন্তরিক সন্তুষ্টি জরুরী।
এবারে
সূরা নিসার পঞ্চম আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতে বলা হয়েছে,"আল্লাহ
তোমাদের জন্য যে ধন সম্পত্তি তোমাদের উপজীবিকা করেছেন,তা অবোধ এতিমদের হাতে
অর্পণ করো না, তবে তা হতে তাদের জীবিকা নির্বাহ করাও, তাদের পরিধান করাও
এবং তাদের সাথে সদ্ভাবে কথা বল।"
এখানে এতিমদের কথা বলা হয়েছে। এতিমরা
প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাদের কাছে সম্পদ অর্পণ করা যাবে না। বরং
ওইসব সম্পদ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে তাদের ভরণ পোষণ করতে হবে। এরপর মহান আল্লাহ
একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক উপদেশ দিয়ে বলেছেন,অবোধ এতিম শিশুদের সাথেও
সুন্দর করে কথা বলতে হবে। অর্থাৎ অপ্রাপ্ত বয়স্ক এতিমদের সাথে কর্কশ ভাষায়
কথা বলা যাবে না। যদি তাদেরকে তাদের সম্পদ না-ও দাও কিন্তু কথা বার্তা এবং
আচরণে তাদের সাথে ভদ্রতা রক্ষা করতে হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
এক.
অর্থ ও সম্পদ সমাজ ব্যবস্থাকে গতিশীল এবং শক্তিশালী করার মাধ্যম । তবে শর্ত
হল, অর্থ ও সম্পদ বুদ্ধিমান সৎ এবং ধার্মিক লোকদের অধিকারে রাখতে হবে।
দুই.ইসলামী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞ ও সৎলোকদের হাতে থাকা উচিত।
তিন.ইসলামের
দৃষ্টিতে দুনিয়ার অর্থ সম্পদ খারাপ কোন কিছু নয়,বরং তা সমাজের অর্থনীতিকে
সুদৃঢ় রাখার মাধ্যম,অবশ্য যদি তা অবিবেচক লোকদের হাতে না পড়ে।
এবারে
সূরা নিসার ষষ্ঠ আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতে বলা হয়েছে,"পিতৃহীনদের
প্রতি লক্ষ্য রাখবে,তাদের শিক্ষা-দীক্ষা দিবে যতদিন তারা বিয়ের যোগ্য না
হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে বুদ্ধির পরিপক্ক বিকাশ দেখা গেলে তাদের সম্পদ তাদের
কাছে ফিরিয়ে দেবে। তারা প্রাপ্ত বয়স্ক হবে বলে তাড়াতাড়ি তা অপব্যয় করো না ও
খেয়ে ফেলোনা এবং যে ধনী সে পারিশ্রমিক নেয়া থেকে বিরত থাকবে। আর যে
দরিদ্র,সে এতিমদের ভরণ পোষণের জন্য পারিশ্রমিক নেয়ার অধিকার রাখে। আর যখন
তোমরা এতিমদের সম্পত্তি তাদের কাছে ফেরত দেবে,তখন তাদের জন্য সাক্ষী রেখো।
হিসাব নেয়ার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। "
এই আয়াতে এতিমদের সম্পত্তি
রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের কাছে সম্পদ ফেরত দেয়ার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে
যাতে সমাজের দুর্বল শ্রেণীর অধিকার রক্ষা পায়। এই পদ্ধতি হলো,
প্রথমত : এতিমরা যথন অর্থ ও সম্পদ রক্ষার মত উপযোগী জ্ঞানের অধিকারী হবে,তখনই তা তাদের কাছে তাদের সম্পদ ফেরত দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত
: এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে ফেরত দেয়ার আগ পর্যন্ত রক্ষা করতে হবে। এতিমরা
প্রাপ্ত বয়স্ক হবার আগেই তাদের সম্পদ খরচ করা যাবে না।
তৃতীয়ত :
এতিমদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ও তাদের ভরণ পোষণের জন্য সেখান থেকে কোন
মজুরী নেয়া যাবে না। অবশ্য যদি বয়স্ক বা দরিদ্র হন, তবে কিছু মজুরী নিতে
পারেন। এছাড়াও এতিমদের সম্পদ ফেরত দেয়ার সময় সাক্ষী রাখতে হবে যাতে এ নিয়ে
কোন মতবিরোধ বা সমস্যা দেখা না দেয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত
: সম্পদের অধিকারী হবার জন্য শুধু শারীরিক পূর্ণতাই যথেষ্ট নয়, জ্ঞান
বুদ্ধির দিক থেকেও পরিপক্ক হতে হবে। তরুণ ও যুবকরা যদি নিজেদের প্রাপ্য
অর্থ সম্পদের অধিকারী হতে চায় তাহলে তাদেরকে অর্থ সম্পদ সম্পর্কে উপযুক্ত
জ্ঞান ও বিবেচনা শক্তি অর্জন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত : অর্থ ও সম্পদের
ব্যাপারে দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতা জরুরী। এক্ষেত্রে আল্লাহকেও মনে রাখতে হবে এবং
সমাজে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য সাক্ষী প্রমাণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
তৃতীয়ত
: স্বচ্ছল ও ধনী ব্যক্তিকে কোন কিছু পাওয়ার আশা না রেখেই সমাজ সেবা করতে
হবে। সমাজ সেবার নামে দরিদ্রের সম্পদ থেকে আয় উপার্জনের চিন্তা অন্যায়।
(৭-১০ আয়াত)

সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলোর আজকের পর্বে
আমরা সুরা নিসার সপ্তম আয়াত থেকে আলোচনা করবো। এই আয়াতের অর্থ হলো,
"বাবা-মা ও আত্মীয় স্বজনের পরিত্যাক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং তাতে
নারীরও অংশ আছে, উত্তরাধিকারগত সম্পদ কম বা বেশী যাই হোক না কেন তাতে
নারীর অংশ নির্দিষ্ট।"
সুরা নিসার প্রথম কয়েকটি আয়াতে এতিম ও অনাথ
শিশুদের প্রসঙ্গ সহ বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী
তুলে ধরা হয়েছে। একটি হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুল (সঃ)'র একজন সাহাবীর
ইন্তেকালের পর তাঁর সমস্ত সম্পত্তি কয়েকজন ভাতিজা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে
নেয়। অথচ ঐ সাহাবীর স্ত্রী ও তাঁর কয়েকটি শিশুকে সম্পত্তির কোন অংশ দেয়া
হয়নি। এর কারণ, অজ্ঞতার যুগে আরবদের বিশ্বাস ছিল শুধুমাত্র যুদ্ধ করতে
সক্ষম পুরুষরাই উত্তরাধিকার বা মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশ
পাবার যোগ্য। মহিলা বা শিশুরা যুদ্ধ করতে সক্ষম নয় বলে তারা উত্তরাধিকার
সূত্রে কোন সম্পদের অংশ পাবার যোগ্য নয়। এ অবস্থায় পবিত্র কোরআনের এই আয়াত
নাজিল হয়। এতে নারীর অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলা হয়েছে মীরাস বা
উত্তরাধিকারগত সম্পদে পুরুষদের যেমন অংশ আছে, তেমনি তাতে নারীদেরও অংশ
রয়েছে। উত্তরাধিকারগত সম্পদ কম বা বেশী যাই হোক না কেন তাতে নারীর অংশ
আল্লাহর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট। এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত :
ইসলাম শুধু নামাজ রোজার ধর্ম নয়। দুনিয়ার জীবনও এ ধর্মের গুরুত্ব পেয়েছে।
আর তাই ইসলাম অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী ও এতিমদের অধিকার রক্ষাকে ঈমানের
শর্ত বলে মনে করে।
দ্বিতীয়ত : আল্লাহর বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকারগত
সম্পদের ভাগ-বন্টন করতে হবে, সামাজিক প্রথা বা পরলোকগত কোন ব্যক্তির
সুপারিশ অনুযায়ী নয়।
তৃতীয়ত : উত্তরাধিকারগত সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে এর
মোট পরিমান কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। মোট পরিমান যাই হোক না কেন সমস্ত ওয়ারিস
বা উত্তরাধিকারীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষাই গুরুত্বপূর্ণ । উত্তরাধিকারগত
সম্পদের মোট পরিমান কম হবার অজুহাতে কোন উত্তরাধিকারীর অধিকারকে উপেক্ষা
করা যাবে না।
এবারে সুরা নিসার ৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই
আয়াতের অর্থ হলো, "সম্পত্তি বন্টনকালে উত্তরাধিকারী নয় এমন গরীব , আত্মীয়,
পিতৃহীন ও অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে তাদেরকে তা থেকে কিছু দিও এবং
তাদের সাথে সদালাপ করবে।"
পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা ও তা জোরদার করতে হলে
সুন্দর ও মানবিক ব্যবহার জরুরী। তাই উত্তরাধিকারগত সম্পদ বন্টনের বিধান
উল্লেখের পরপরই কোরআনের আয়াতে এ সম্পর্কিত দুটি নৈতিক বিধান উল্লেখ করা
হয়েছে। এর একটি হলো, উত্তরাধিকারগত সম্পদ বন্টনের সময় আত্মীয় স্বজন বিশেষ
করে এতিম ও দরিদ্র-আত্মীয় স্বজন উপস্থিত থাকলে তারা সম্পদের উত্তরাধিকারী
না হওয়া সত্ত্বেও সব উত্তরাধিকারীর সম্মতি নিয়ে মোট উত্তরাধিকার থেকে
তাদেরকে কিছু দেয়া যেতে পারে ও দরিদ্র আত্মীয় স্বজনের মধ্যে ধনী আত্মীয়ের
প্রতি যদি হিংসা বিদ্বেষ থেকেও থাকে, তাহলে এই দানের ফলে তা প্রশমিত হতে
পারে এবং পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধনও এতে শক্তিশালী হবে। দ্বিতীয় নৈতিক
বিধানে বঞ্চিত ও দরিদ্র আত্মীয় স্বজনের সাথে সুন্দর এবং ভদ্রভাবে কথা বলার
নিদের্শ দেয়া হয়েছে, যাতে তারা এমন ধারণা করার সুযোগ না পায় যে, দারিদ্রের
কারণে তাদের সাথে নিদর্য় আচরণ করা হচ্ছে। তাহলে এই আয়াতের মূল শিক্ষণীয়
দিকগুলো হলো,
• বঞ্চিতদের স্বাভাবিক চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। জরুরী প্রয়োজন ছাড়াও তাদেরকে বিভিন্ন ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে।

উপহার দেয়া এবং সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক জোরদার করতে
হবে। বস্তুগত তথা বৈষয়িক বিষয়ে উপকার করার পাশাপাশি ভালবাসাপূর্ণ আত্মিক
সম্পর্কের মাধ্যম আত্মীয় ও আপনজনদের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ প্রতিরোধ করা
উচিত।
এবারে সুরা নিসার ৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতের অর্থ
হলো, "নিজেদের অসহায় সন্তানদের ছেড়ে গেলে ভবিষ্যতে তাদের কি হবে এই ভেবে
যারা উদ্বিগ্ন তাদের উচিত অন্য মানুষদের এতিম সন্তানের ব্যাপারেও অনুরুপ ভয়
করা এবং আল্লাহকে ভয় করা ও সদভাবে কথা বলা উচিত।"
পবিত্র কোরআন এতিমদের
ব্যাপারে মানুষের মধ্যে দয়া সঞ্চারের জন্য তাদের অসহায় সন্তানের একটি
কল্পিত দৃষ্টান্ত দিচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, ধরে নেয়া যাক, তারা এমন
পাষান-হৃদয় মানুষের তত্ত্বাবধানে রয়েছে যিনি তাদের কচি মনের অনুভুতিকে কোন
গুরুত্বই দেন না এবং তাদের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ন্যায় বিচার করেন না।
এমন অবস্থায় মানুষ নিশ্চয়ই এই ভেবে উদ্বিগ্ন হবে যে তাদের মৃত্যুর পর
অন্যরা তাদের সন্তানদের সাথে কেমন ব্যবহার করবে ? এরপর আল্লাহ বলেছেন, "হে
মানুষ, অন্যদের এতিম সন্তানের সাথে আচরণের ব্যাপারে তোমাদেরকেও আল্লাহকে
মনে রাখতে হবে। তাদের সাথে অন্যায় ব্যবহার না করে ভাল ও পছন্দনীয় আচরণ কর।
এতিমদের মন জয় কর এবং তাদেরকে ভালবেসে তাদের স্নেহের চাহিদা পূরণ করবে।"
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
• এতিম ও সমাজের বঞ্চিত লোকদের সাথে এমন ব্যবহার করা উচিত যেমন ব্যবহার অন্যরাও আমাদের সন্তানদের সাথে করবে বলে আমরা আশা রাখি।

সমাজে ভাল ও মন্দ কাজের প্রতিফল দেখা যায়। এমনকি এই প্রতিফল আমাদের
মৃত্যুর পর আমাদের সন্তানদের কাছেও পৌঁছে। তাই , আমাদের কাজ - কর্মের
সামাজিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমরা যেন অসচেতন না থাকি।
• শুধু পোশাক ও খাবারই এতিমদের চাহিদা নয়। তাদের মনের øেহের চাহিদা মেটানো আরো গুরুত্বপূর্ণ।
এবারে
সুরা নিসার ১০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতের অর্থ হলো, "যারা
অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয়ই তারা তাদের পেট আগুন দিয়ে
পূর্ণ করছে। শীঘ্রই তারা জ্বলন্ত আগুনে জ্বলবে।"
এই আয়াতে এতিমদের প্রতি
অন্যায় আচরণের প্রকৃত স্বরুপ তুলে ধরে বলা হয়েছে, এতিমদের সম্পদ গ্রাস করা
আগুন খাওয়ার সমতুল্য । কারণ, কিয়ামতের সময় তা আগুন হয়ে দেখা দেবে।
আমরা
এই পৃথিবীতে যা যা করি, তার একটি বাহ্যিক চেহারা রয়েছে। কিন্তু এসব কাজের
প্রকৃত চেহারা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। এসব কাজের প্রকৃত চেহার পরকালেই
স্পষ্ট হবে। পরকালের শাস্তি আমাদের কাজেরই ফল মাত্র। যে এতিমের সম্পদ গ্রাস
করে, তার হৃদয় যেমন পুড়বে, তিমনি বিবেকও এই অপরাধের জন্য তাকে দংশন করবে।
এই অপরাধ অত্যাচারীর সমস্ত অস্তিত্বকে অগ্নিদগ্ধ করবে। আগের আয়াতে এতিমদের
ওপর অত্যাচারের সামাজিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে । আর এই আয়াতে এতিমদের সাথে
অন্যায় আচরণের সুপ্ত প্রতিফলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ঈমানদার লোকেরা
এতিমদের সম্পদে হাত দেয়ার আগে এই প্রতিফলের কথা মনে রেখে তা থেকে বিরত হয়।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : হারাম সম্পদ ভোগ করা , বিশেষ
করে, এতিমদের সম্পদ গ্রাস করা বাহ্যিকভাবে উপভোগ্য মনে হলেও তা প্রকৃত
পক্ষে আত্মা ও বিবেকের জন্য যন্ত্রণাদায়ক এবং এ অপরাধ মানুষের ভালো গুন
বিনষ্ট করে।
দ্বিতীয়ত : পরকালে দোযখের আগুন আমাদের মন্দ কাজেরই প্রতিফল।
আল্লাহ তার বান্দাদেরকে কখনও পুড়তে চান না। কিন্তু আমরা আমাদের নিজেদের
গোনাহ হতেই অগ্নিদগ্ধ হচ্ছি।


(১১- ১৪ নং আয়াত)

আজ সূরা নিসার ১১ থেকে ১৪ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন
করা হবে। প্রথমে দেখা যাক এই সূরার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে কি বলা হয়েছে-
"আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের উত্তরাধিকারগত সম্পদ সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন,
এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমান। কিন্তু দুয়ের বেশী কন্যা থাকলে তারা পাবে
পরিত্যাক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ, আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্য
অর্ধাংশ । মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির পিতা ও মাতা
প্রত্যেকেই পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ। আর যদি মৃত ব্যক্তি নিঃসন্তান হয় এবং
শুধু তার পিতা মাতাই উত্তরাধিকারী হলে তার মায়ের জন্য তিন ভাগের এক ভাগ,আর
মৃত ব্যক্তির ভাই বোন থাকলে মা পাবে ১/৬ ভাগ। এসব কিছুই সে যা অসিয়ৎ করে
গেছে, সেই অসিয়ৎ পালন এবং তাঁর ঋণ শোধের পর প্রযোজ্য । তোমাদের পিতা ও
সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য বেশী উপকারী তা তোমরা জান না,এও আল্লাহর
নির্দেশ । নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।"
"তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাওয়া
সম্পত্তির অর্ধাংশ তোমাদের জন্য যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে, তাদের
সন্তান থাকলে ,তোমাদের জন্য তাদের পরিত্যাক্ত সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ । এসব
কিছুই তারা যা ওসিয়ৎ করে, তা দেয়ার পর এবং তাদের ঋণ শোধের পর। তোমাদের
সন্তান না থাকলে , তাদের জন্য তোমাদের সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ, আর তোমাদের
সন্তান থাকলে তাদের জন্য তোমাদের সম্পত্তির ৮ ভাগের এক ভাগ। এসবই তোমরা যা
ওসিয়ৎ করবে তা দেয়ার পর ও ঋণ শোধের পর প্রযোজ্য। যদি কোন পুরুষ মারা যায়
(সন্তান ও পিতা-মাতাহীন অবস্থায়)এবং বৈমাত্রেয় ভাই-বোনই যদি তার একমাত্র
উত্তরাধীকারী হয় অথবা কোন নারী যদি মারা যায় (সন্তান ও পিতা-মাতাহীন
অবস্থায়,তার ভাই-বোনই যদি তা একমাত্র উত্তরাধীকারী হয় তাহলে তারা
প্রত্যেকেই পাবে এক ষষ্ঠাংশ । তারা এর বেশী হলে সকলে অংশীদার হবে এক
তৃতীয়াংশের। এটাও ওসিয়ৎ ও ঋণ শোধের পর প্রযোজ্য। যদি এটা কারও জন্য হানিকর
না হয় । এটা আল্লাহর নির্দেশ । আল্লাহ সর্বজ্ঞ ,সহনশীল। "

মানুষকে
যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই আল্লাহই যেহেতু ধর্মীয় বিধি-বিধান দিয়েছেন তাই তার
নির্দেশ ও আইন কানুন মানুষের প্রকৃতিগত চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের সাথে বস্তু জগতের সম্পর্ক,মালিকানা, কর্তৃত্ব সব
কিছু ছিন্ন হয় এবং মানুষ অন্য জগতে প্রবেশ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মানুষ
মৃত্যুর আগে জীবদ্দশায় সে সব অর্জন করে সে সবের কি পরিণতি হয় এবং সে গুলো
কার কাছে হস্তান্তর করা হয় ? কিছু গোত্রের মধ্যে মৃত ব্যক্তির ধন সম্পদ তার
পিতা,পুত্র,ভাই এ ধরনের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ভাগ করে দেয়ার রীতি প্রচলিত
আছে। ওই সব গোত্রে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ,কন্যা সন্তান বা মহিলারা কোন
সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পান না। আর বর্তমান আধুনিক কিছু দেশে মৃত
ব্যক্তির সম্পদকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং ওই সম্পদে
সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয় -স্বজনের অধিকারের কোন স্বীকৃতি দেয়া হয় না। কিন্তু
ইসলামের বিধান এ থেকে ভিন্ন। ইসলাম ধর্মে উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মৃত
ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ ছেলে ও মেয়ে সন্তান,স্ত্রী এবং নিকট আত্মীয়দের
মধ্যে বন্টন করে দেয়া হয়। একই সাথে ইসলাম ধর্মে মৃত ব্যক্তির জন্যও কিছু
অধিকার দেয়া হয়েছে। মৃত ব্যক্তি তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ ইচ্ছেমত ওসিয়ত
করতে পারবে যাতে তা তার মৃত্যুর পর তার ইচ্ছে অনুযায়ী ব্যয় করা হয়। ইসলামের
এ অসাধারণ উত্তরাধিকার আইনের ফলে যাদের যথেষ্ট সম্পদ আছে তারা জীবনের শেষ
দিন পর্যন্ত কর্মতৎপরতা চালায়। কারণ তারা জানে যে তাদের মৃত্যুর পর সম্পদের
মালিক হবে তাদেরই সন্তান-সন্তুতি যারা কিনা তার নাম ও স্মৃতি চিরঞ্জীব
রাখবে। এ জন্য ইসলাম ধর্মে প্রথম ধাপে উত্তরাধিকার ভাগ করা হয় সন্তানদের
মধ্যে এবং এরপর নিকট আত্মীয়দের মধ্যে। উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পুত্র
সন্তানকে কন্যা সন্তানের দ্বিগুণ সম্পদ দেয়া হয়। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে
সংসারের ভরণ পোষণের দায় দায়িত্ব পুরুষের। এ দায়িত্ব পালনের জন্যে পুরুষকে
অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা চালাতে হয়। তাই তার মূলধন ও পুঁজির প্রয়োজন হয়
বেশী। বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হবে ইসলামের উত্তরাধিকার আইন মহিলাদের বিপক্ষে
। কিন্তু ইসলামের অন্যান্য আইন কানুনের দিকে তাকালে বুঝা যায়,আসলে
উত্তরাধিকার আইন নারীর স্বার্থের অনুকূলে । কারণ ইসলামের পারিবারিক
ব্যবস্থায় অর্থ উপার্জনের কোন দায়িত্ব স্ত্রীর উপর অর্পিত হয়নি। স্ত্রীর
ভরণ পোষণ,পোশাক-আশাক, বাসস্থানসহ যাবতীয় চাহিদা মেটাবার দায়িত্ব স্বামীর।
ফলে মহিলারা উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী একভাগ সম্পত্তি পেলেও পুরোটাই
ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় কিংবা নিজের জন্য সঞ্চয় হিসেবে রেখে দিতে পারেন। পুরুষ
উত্তরাধিকারসূত্রে দুই ভাগ সম্পত্তি পেলেও তাকে কমপক্ষে অর্ধেক সম্পদ অথবা
তারও বেশী স্ত্রীর মোহরানা ও ভরণ পোষণ বাবদ ব্যয় করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে
মহিলারা উত্তরাধিকার সূত্রে যে একভাগ সম্পত্তি পান সেটার মালিক এবং পুরুষ
উত্তরাধিকার সূত্রে যে দুভাগ সম্পত্তি পায় তারও এক অংশের মালিক। অর্থাৎ
মহিলারা একভাগ সম্পত্তি সঞ্চয় হিসেবে রাখতে পারে এবং স্বামীর সাথে অংশীদার
আরেক ভাগ সম্পদ দৈনন্দিন ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। অথচ স্ত্রীর
সম্পত্তির ওপর পুরুষের কোন অধিকার নেই এবং পুরুষকে নারীর সব প্রয়োজন ও
চাহিদা মেটাতে হয়। সূরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতের মৃত ব্যক্তির বাবা-মা
,সন্তান-সন্ততি এবং স্ত্রীর মধ্যে সম্পদ বন্টনের নিয়ম বলা হয়েছে। অবশ্য
ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের খুঁটিনাটি সব কিছু এ দুই আয়াতে বলা হয়নি।
নির্ভরযোগ্য হাদিসে এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। অবশ্য বলে রাখা দরকার
যে,মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বন্টনের আগে প্রথমে মৃত
ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ এবং তার ওসিয়ত বাস্তবায়ন করতে হয়। কারণ উত্তরাধিকারদের
চেয়ে মৃত ব্যক্তি এবং অন্যান্য মানুষের অধিকার অগ্রগণ্য।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে,
এক.
উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষদের অর্ধেক
সম্পত্তি পেয়ে থাকে। এটা তাদের প্রতি অবিচার নয়। বরং এটা সামাজিক জীবনের
পার্থক্য এবং মহাবিজ্ঞ আল্লাহ পাকের নির্দেশ থেকে উৎসারিত হয়েছে।
দুই.
মানুষের অধিকার আদায় করা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এ দুই আয়াতে চার বার এ
সম্পর্কে জোর দেয়া হয়েছে। যাতে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা অন্য মানুষের
অধিকারের কথা ভুলে না যায়।
এবারে সুরা নিসার ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াত নিয়ে
আলোচনা করবো। এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে,"এ সব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা । কেউ
আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। যার
পাদদেশে নদী প্রবাহিত,সেখানে তারা স্থায়ী ভাবে বাস করবে এবং এটা মহাসাফল্য।
আর কেউ আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্য হলে এবং তার নির্ধারিত সীমা লংঘন করলে
তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য রয়েছে
লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।"

উত্তরাধিকার সম্পর্কিত আয়াতের পর এ দুই
আয়াতে আল্লাহ পাক বিশ্বাসী ব্যক্তিদেরকে আর্থিক ব্যাপারে বিশেষ করে মৃত
ব্যক্তির সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার আহবান
জানিয়েছেন এবং তার নির্দেশ লংঘনের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। কারণ
আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা ভয়াবহ কঠিন। এ দুই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে
যে,আল্লাহর আনুগত্য মানে কেবল তার এবাদত বা উপাসনা নয়। বরং সামাজিক ও
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার মেনে চলা হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য ও
ধার্মিকতার শর্ত। সেই ব্যক্তি ও সমাজই কল্যাণের অধিকারী হবে যে এই বিধান
তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে মেনে চলবে।
এ দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে,
প্রথমত : দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণের অধিকারী হওয়ার উপায় হচ্ছে ইসলামের বিধান মেনে চলা।
দ্বিতীয়ত : মানুষের অধিকার যারা গ্রাস করে তারা কাফেরদের পর্যায়ে পড়ে এবং তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।
তৃতীয়ত
: মৃত ব্যক্তি তার ঋণ পরিশোধ অথবা সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বন্টনের
ক্ষেত্রে অনিয়ম হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য যদিও উপস্থিত নেই,তবুও মনে রাখা
দরকার যে,আল্লাহ আছেন এবং যারা মানুষের অধিকার পদদলিত করে তাদের জন্য কঠিন
শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

(১৫- ১৮ আয়াত)

আজকের আসরে যথারীতি সূরা নিসার ১৫ থেকে ১৮
আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। শুরুতেই দেখা যাক
১৫ নং আয়াতে কি বলা হয়েছে, "তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যাভিচার
করে,তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী তলব করবে,যদি তারা
সাক্ষ্য দেয়,তবে তাদেরকে গৃহে অবরুদ্ধ করবে,যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয়
অথবা আল্লাহ তাদের জন্য কোন ব্যবস্থা না করেন।"

গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম, সূরা
নিসার প্রথম কয়েকটি আয়াত পরিবার সম্পর্কিত। যেসব নারী ও পুরুষ পারিবারিক
পবিত্রতা লংঘনের মত অবৈধ ও নোংরা কাজে লিপ্ত হয় আজকের আলোচনায় তাদের
শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হবে। সূরা নিসার ১৫ নম্বর আয়াতে স্বামীর সাথে ঘর
সংসার করছেন এমন মহিলারা যদি পর-পুরুষের সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হন,তাহলে
তাদের শাস্তি কি হবে,তা উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য এটাও জানা জরুরী যে,ইসলাম
পারিবারিক মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে অন্যদের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি নিষেদ্ধ
করেছে। অন্যদের অবৈধ কাজ প্রমাণ করতেও ইসলাম উৎসাহ দেয় না। তাই তিন জন
ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিও যদি কোন বিবাহিতা মহিলার ব্যাভিচারের ব্যাপারে সাক্ষ্য
দেয় তা গ্রহণযোগ্য হবে না। অবশ্য একসাথে চার জন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তি এ
ধরনের সাক্ষ্য দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর এ ক্ষেত্রে বিবাহিতা ব্যাভিচারী
মহিলার শাস্তির যে বিধান দেয়া হয়েছে,তা অস্থায়ী বিধান অর্থাৎ মৃত্যু না
হওয়া পর্যন্ত তাকে স্বামীর ঘরে বন্দী রাখতে হবে। পরিবারের মান মর্যাদা
রক্ষার জন্যেই আল্লাহ এ ধরনের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে অসামাজিক কাজে লিপ্ত
মানুষেরা এক জায়গায় সমবেত হয়ে একে অন্যের কাছে খারাপ কাজের বিভিন্ন পদ্ধতি
ছড়িয়ে না দেয়। যেমন,আজকাল আমরা দেখছি গণ কারাগারগুলো অবৈধ তৎপরতা শিক্ষার

imam1979
আমি আন্তরিক
আমি আন্তরিক

পোষ্ট : 32
রেপুটেশন : 6
নিবন্ধন তারিখ : 15/07/2011

Back to top Go down

সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)  Empty Re: সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)

Post by sampa tripura on 2011-07-30, 00:39

Code:
কারণ,মানুষের মধ্যে
অঞ্চল,বর্ণ,গোষ্ঠী ও ভাষার ভিত্তিতে বৈষম্য করা নিষিদ্ধ। আল্লাহ প্রত্যেক
মানুষকেই একই উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছেন।
এই বিষয় গুলির প্রতি আমার অসম্ভব শ্রদ্ধা সময় পেলেই পড়ি
sampa tripura
sampa tripura
তারকা সদস্য
তারকা সদস্য

লিঙ্গ : Female
পোষ্ট : 139
রেপুটেশন : 5
শুভ জন্মদিন : 16/11/1995
নিবন্ধন তারিখ : 07/05/2011
বয়স : 24
অবস্থান : ভারত
পেশা : ছাত্রী
মনোভাব : ঠান্ডা

http://www.co

Back to top Go down

সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)  Empty Re: সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)

Post by imam1979 on 2011-07-30, 07:17

প্রিয় সম্পা,
মতামতের জন্য ধন্যবাদ।পবিত্র বিষয়ের প্রতি আপনার শ্রধ্বা,এজন্য আপনার প্রতিও শ্রধ্বা বেড়ে গেল।আরো লিখুন ও মতামত দিন।

imam1979
আমি আন্তরিক
আমি আন্তরিক

পোষ্ট : 32
রেপুটেশন : 6
নিবন্ধন তারিখ : 15/07/2011

Back to top Go down

সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)  Empty Re: সূরা নিসা ( ১-১৮ নং আয়াত)

Post by Sponsored content


Sponsored content


Back to top Go down

Back to top


 
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum